মোঃ শরিফ বিল্লাহ,ডোমার উপজেলা প্রতিনিধি:
বাংলাদেশের এক সময়ের গর্ব ‘সোনালী আঁশ’ বা পাট আজ অস্তিত্ব সংকটে। আন্তর্জাতিক বাজারে পাটের ব্যাপক চাহিদা থাকা সত্ত্বেও অভ্যন্তরীণ বাজারে এক শ্রেণির অসাধু সিন্ডিকেটের কারসাজিতে পাটের দাম এখন সাধারণ উদ্যোক্তা ও মিল মালিকদের নাগালের বাইরে। এর ফলে একের পর এক বন্ধ হয়ে যাচ্ছে পাটকল, আর কর্মহীন হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন এই শিল্পের সাথে জড়িত হাজারো মানুষ।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, পাট মৌসুমে কৃষকের কাছ থেকে কম দামে পাট কিনে তা অবৈধভাবে গুদামজাত করে রাখছে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট। যখন বাজারে পাটের সরবরাহ কমে যায়, তখন তারা কৃত্রিম সংকট তৈরি করে অস্বাভাবিক চড়া দামে পাট বিক্রি শুরু করে। এই অশুভ প্রতিযোগিতার ফলে গত কয়েক বছরে পাটের দাম কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি পাটকলগুলো এই চড়া দামে কাঁচামাল কিনে উৎপাদন চালিয়ে নিতে হিমশিম খাচ্ছে।
পাটের অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব পড়েছে উৎপাদন খাতে। কাঁচামালের উচ্চমূল্যের কারণে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় অনেক মিল মালিক লোকসানের মুখে পড়েছেন। গত দুই বছরে দেশের বেশ কিছু বেসরকারি পাটকল তাদের উৎপাদন বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছে। মিলগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিদেশে রপ্তানি আদেশ সময়মতো সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না, ফলে বাংলাদেশ বৈশ্বিক বাজারের একটি বড় অংশ হারাচ্ছে।
এই সংকটের সবচেয়ে বড় শিকার সাধারণ শ্রমিক ও প্রান্তিক চাষি। পাটকলগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় হাজার হাজার শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েছেন। পরিবারের ভরণপোষণ জোগাতে অনেকে রিকশা চালানো বা দিনমজুরির মতো পেশায় যোগ দিচ্ছেন।
সিন্ডিকেটের কারণে কৃষক সঠিক সময়ে সঠিক মূল্য পাচ্ছে না। তারা কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে, অথচ সেই পাটই কয়েক মাস পর কয়েক গুণ দামে বিক্রি হচ্ছে বাজারে।
পাটকল মালিক সমিতির একজন প্রতিনিধি জানান, “কাঁচামালের দাম নিয়ন্ত্রণে না আনলে এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখা অসম্ভব। সিন্ডিকেট ভাঙতে না পারলে আমরা আন্তর্জাতিক বাজারে ভারতের মতো দেশগুলোর সাথে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারব না।”
অন্যদিকে, ভুক্তভোগী এক শ্রমিক আক্ষেপ করে বলেন, “বাপ-দাদার আমল থেকে জুট মিলে কাজ করছি। এখন মিল বন্ধ হবার উপক্রম, ঘরে খাবার নেই। পাটের সুদিন ফিরলে আমাদের পেটে ভাত জুটত।
সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে পাটের বাজারে কঠোর তদারকি চালাতে হবে এবং অবৈধ মজুদদারদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি পাট কেনার জন্য সরকারি ক্রয় কেন্দ্রের সংখ্যা বাড়াতে হবে।
বন্ধ হয়ে যাওয়া মিলগুলো চালু করতে সহজ শর্তে ঋণ ও প্রণোদনা প্রদান করা জরুরি। পাটজাত পণ্যের রপ্তানি বাড়াতে নতুন নতুন আন্তর্জাতিক বাজার খুঁজে বের করতে হবে। সোনালী আঁশ পাটের ঐতিহ্য ধরে রাখতে হলে এখনি কার্যকর প্রদক্ষেপ গ্রহন করতে হবে । নতুবা কালের গর্ভে হারিয়ে যাবে পাটশিল্প।

