সুলতান মাহমুদ, দিনাজপুর :
দিনাজপুর সদরের দক্ষিণ গোবিন্দপুর গ্রাম শীত এলেই এক ভিন্ন রূপে ধরা দেয়। গ্রামের পাকা রাস্তার দুই পাশে সারি সারি খেজুর গাছ যেন শীতের আগমনী বার্তা দেয়। ভোরের কুয়াশা ভেদ করে গাছিরা গাছে ওঠেন, কেটে দেন খেজুর গাছের মাথা, মাটির হাঁড়িতে ঝরে পড়ে মিষ্টি রস। এই খেজুরের রস শুধু শীতকালীন ঐতিহ্যই নয়, অনেক পরিবারের জীবিকার প্রধান অবলম্বনও।
সদরের আস্করপুর ইউনিয়নের দক্ষিণ গোবিন্দপুর গ্রামের অভিজ্ঞ গাছি মোকসেদ আলী (৫০)। দীর্ঘদিন ধরে তিনি খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহ করে আসছেন। শীত এলেই তাঁর দিন শুরু হয় ভোররাতে। স্ত্রী মল্লিকা বেগম সব সময় তাঁকে সহযোগিতা করেন। রস সংগ্রহের পর তা ছেঁকে পরিষ্কার করা, ক্রেতাদের পরিবেশন এবং বিক্রির কাজ সামলান মল্লিকা বেগমই। এই দম্পতির সংসার মূলত শীতকালজুড়ে খেজুরের রস বিক্রির আয়েই চলে।
মোকসেদ আলী জানান, খেজুর গাছ কেটে শুধু রস সংগ্রহ নয়, নিরাপদভাবে রস সংগ্রহ করাটাও বড় দায়িত্ব। নিপা ভাইরাসের ঝুঁকির কথা আমরা জানি। তাই পাখি, বাদুড় কিংবা সাপ যেন খেজুর গাছের রসের হাঁড়িতে মুখ না দিতে পারে, সে জন্য গাছের মুখে বাঁশের তৈরি ‘বানা’ ও নেট ব্যবহার করছি। তিনি আরও বলেন, প্রতিদিন গড়ে ১৫ থেকে ২০ লিটার রস বিক্রি করেন। প্রতি লিটার রস ৪০ টাকা দরে বিক্রি করে তাঁর দৈনিক আয় হয় প্রায় ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা। এই আয় দিয়েই শীত মৌসুমে পরিবারের খরচ, সন্তানদের পড়াশোনা ও সংসারের প্রয়োজন মেটান তিনি।
স্ত্রী মল্লিকা বেগম বলেন, আগের মতো এখন আর খোলা হাঁড়িতে রস রাখি না। সবাই ভয় পায় নিপা ভাইরাসের কারণে। তাই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা মেনে চলি। অনেক ক্রেতা এখন জিজ্ঞেস করেন, নেট ব্যবহার করা হয়েছে কি না। নিরাপদ রস দিলে ক্রেতারাও খুশি থাকেন। নিপা ভাইরাস সম্পর্কে সচেতন হয়ে রস সংগ্রহ করায় মোকসেদ- মল্লিকা দম্পতির রসের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে।
ভোর হতেই দূর-দূরান্ত থেকে তরুণ-তরুণীসহ নানা বয়সের মানুষ দক্ষিণ গোবিন্দপুর গ্রামে ভিড় করেন। কেউ সরাসরি গাছের নিচে দাঁড়িয়ে রস পান করেন, আবার কেউ বাড়ির জন্য অল্প পরিমাণে নিয়ে যান। খেজুরের রস খেতে আসা তরুণ রাকিব হাসান বলেন, “এই রস একেবারেই খাঁটি। গাছ থেকে নামানো রসের স্বাদ আলাদা। সবচেয়ে ভালো লাগছে, এখানে নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।
একই মত প্রকাশ করেন রিফাত। তিনি বলেন, নেট আর বানা ব্যবহার করায় আমরা নিশ্চিন্তে রস খেতে পারছি। আরজুনা আক্তার ও রুনা আক্তার জানান, খেজুরের প্রকৃত ফ্লেভার পাওয়ার জন্য তাঁরা ভোরে এসেছেন। আমাদের চোখের সামনে থেকে খেজুর গাছ থেকে পেড়ে রস আমাদের কাছে পরিবেশন করেছে।
ফিয়ান চৌধুরী ও রেজওয়ানও বলেন, নিরাপদ পদ্ধতিতে সংগ্রহ করা রস হওয়ায় তাঁরা সন্তুষ্ট এবং পরিবার-পরিজনের জন্যও নিয়ে যাচ্ছেন। তবে স্বাস্থ্যঝুঁকির দিকটি একেবারে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। শরিফুল ইসলাম সাজু বলেন, অনেকদিন পর খেজুরের রস পেট ভরে খেয়েছি। বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার জন্য ৪ লিটার খেজুরের রস বাসায় নিয়ে যাচ্ছি পায়েস করে খাব।
দিনাজপুরের ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা.শাহ মোহাম্মদ শরীফ খেজুরের রস নিয়ে ভিন্ন সতর্কতার কথা তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, খেজুরের রসে নিপা ভাইরাস বহনের আশঙ্কা রয়েছে। এর প্রধান বাহক হচ্ছে বাদুড়। অনেক সময় বাদুড় সরাসরি রস খেতে না পারলেও নেট বা বানা’র ওপর প্রস্রাব করে দিতে পারে। বাদুড় বা পাখির লালা থেকেও নিপা ভাইরাসের জীবাণু রসে এসে মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে পারে। তিনি বলেন, নিপা ভাইরাস মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে। তাই কাঁচা খেজুরের রস পান না করে ফুটিয়ে খাওয়া ভালো।
