সত্যজিৎ দাস (মৌলভীবাজার প্রতিনিধি):
মৌলভীবাজার জেলার পর্যটননগরী শ্রীমঙ্গলের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দীর্ঘদিন ধরে তীব্র জনবল সংকটের কারণে চিকিৎসাসেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। প্রয়োজনের তুলনায় চিকিৎসক,নার্স ও সহায়ক কর্মীর সংখ্যা অত্যন্ত কম থাকায় দায়িত্বরত চিকিৎসকদের রোগীদের কাঙ্ক্ষিত সেবা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। হাসপাতালের সামগ্রিক ব্যবস্থাপনাতেও দেখা দিয়েছে নানা সীমাবদ্ধতা।
৫০ শয্যার এই হাসপাতালটি বর্তমানে পরিচালিত হচ্ছে মাত্র একটি অ্যাম্বুলেন্স, একজন চালক এবং একজন নৈশপ্রহরীর মাধ্যমে। অথচ প্রয়োজন অনুযায়ী এখানে অন্তত দুটি অ্যাম্বুলেন্স ও দুজন চালক থাকার কথা।
স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অফিস সূত্রে জানা গেছে, প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ বহু পদ শূন্য রয়েছে। বর্তমানে ছয়টি কনসালটেন্ট পদ খালি রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে জুনিয়র কনসালটেন্ট (মেডিসিন),(চর্ম ও যৌন),(গাইনি), (কার্ডিওলজি),(নাক-কান-গলা) এবং (চক্ষু)।
এছাড়া মেডিকেল অফিসারের ৫টি,আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ১টি,সহকারী সার্জনের ৪টি,সিনিয়র স্টাফ নার্সের ৭টি এবং ফার্মাসিস্টের ১টি পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে।
প্রযুক্তিগত ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রেও রয়েছে ঘাটতি। মেডিকেল টেকনোলজিস্ট (এসআই) ১টি,মেডিকেল টেকনোলজিস্ট (রেডিওগ্রাফি) ১টি,পরিসংখ্যানবিদ ১টি,কার্ডিওগ্রাফার ১টি, কম্পিউটার অপারেটর ১টি এবং অফিস সহকারী কাম ডাটা এন্ট্রি অপারেটরের ১টি পদ খালি রয়েছে।
অন্যান্য শূন্য পদের মধ্যে রয়েছে;স্বাস্থ্য সহকারী ৪টি,হেলথ এডুকেটর ১টি,অফিস সহায়ক ২টি, ওয়ার্ড বয় ২টি,আয়া ১টি,বাবুর্চি ১টি এবং পরিচ্ছন্নতা কর্মীর ৩টি পদ।
অনুসন্ধানে জানা যায়,দীর্ঘদিন জনবল সংকটের কারণে হাসপাতালের গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা সরঞ্জামও সচল রাখা সম্ভব হয়নি। ফলে প্রায় ১৮ বছর ধরে এক্স-রে মেশিন,আলট্রাসনোগ্রাম মেশিন এবং ইসিজি মেশিন অকেজো অবস্থায় পড়ে আছে।
এদিকে চিকিৎসক সংকটের কারণে উপজেলার চারটি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসারদের দিয়ে জরুরি বিভাগের দায়িত্ব পালন করানো হচ্ছে। এতে তৃণমূল পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবাও ব্যাহত হচ্ছে।
বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে,হাসপাতালটিতে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জামেরও ঘাটতি রয়েছে। বর্তমানে হাসপাতালের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির তুলনায় অনেক কম রয়েছে। হাসপাতালে আগত রোগীদের সঠিক সেবা প্রদানে জরুরি ভিত্তিতে বিপি মেশিন ৫০টি, স্টেথোস্কোপ ৫০টি,ডিজিটাল ওজন মাপার মেশিন ১০টি,নেবুলাইজার ২০টি,পালস অক্সিমিটার ২০টি,ইসিজি মেশিন ১০টি, অক্সিজেন কনসেন্ট্রেটর ১০টি এবং স্টেরিলাইজার ও অটোক্লেভ ৫টি করে প্রয়োজন।
হাসপাতালের অবকাঠামোও পুরোপুরি রোগীবান্ধব নয়। প্রবীণ ও প্রতিবন্ধী রোগীদের জন্য পর্যাপ্ত সুবিধা নেই। তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির পদে দীর্ঘদিন ধরে নিয়োগ বন্ধ রয়েছে।
আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে আয়া,ওয়ার্ড বয়, স্ট্রেচার বয়,ওটি বয়,টিকিট ক্লার্ক ও বাবুর্চি নিয়োগ দেওয়া হলেও সংখ্যাটি প্রয়োজনের তুলনায় কম। বিশেষ করে পরিচ্ছন্নতা কর্মীর ঘাটতির কারণে হাসপাতাল ব্যবস্থাপনায় প্রতিনিয়ত সমস্যা দেখা দিচ্ছে। পর্যাপ্ত নিরাপত্তা কর্মীও নেই।
চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য নিয়োগ-পরবর্তী বাধ্যতামূলক ইন-সার্ভিস প্রশিক্ষণের কার্যকর ব্যবস্থা নেই। কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে নিয়মিত ওষুধ সরবরাহ নিশ্চিত করা যায় না। মাঠপর্যায়ে আধুনিক পদ্ধতিতে স্বাস্থ্যশিক্ষা প্রচারেরও কার্যকর উদ্যোগ নেই।
ইপিআই টিকা পরিবহনের জন্য স্থায়ী পোর্টার না থাকাও একটি বড় সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে।
উপজেলার কয়েকটি অর্থবছরের বরাদ্দকৃত বাজেট বিশ্লেষণ করে দেখা যায়,উপজেলা হাসপাতালের জন্য বরাদ্দ বাজেটও প্রয়োজনের তুলনায় কম। বাজেট বণ্টনেও রয়েছে নানা জটিলতা। বিভিন্ন অর্থনৈতিক কোডে বরাদ্দের অভাব এবং কিছু কোড আইবাসে অন্তর্ভুক্ত না থাকায় প্রশাসনিক কার্যক্রমেও সমস্যা তৈরি হচ্ছে।
অন্যদিকে হাসপাতালের জরুরি অবকাঠামো মেরামতের ক্ষেত্রেও জটিলতা রয়েছে। নিজস্ব অর্থায়নের ক্ষমতা না থাকায়,স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের মাধ্যমে কাজ করাতে গিয়ে তৈরী হয় জটিলতা।
উপজেলা পর্যায়ে নিজস্ব বর্জ্য ব্যবস্থাপনা না থাকায় হাসপাতাল-সংশ্লিষ্ট সংক্রমণের ঝুঁকিও বাড়ছে। তাছাড়া ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি রোগী ভর্তি থাকায় সেবার মানও ব্যাহত হচ্ছে।
শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সিনথিয়া তাসমিন বলেন,’জনবল সংকটের মধ্যেও রোগীদের সেবা দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে পরিচ্ছন্নতা কর্মীর অভাব সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্বল্প জনবল নিয়ে স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। তিনি জানান,পর্যাপ্ত চিকিৎসক,নার্স ও পরিচ্ছন্নতা কর্মী নিয়োগ দেওয়া হলে সেবার মান অনেক উন্নত হবে। এ বিষয়ে সিভিল সার্জনের কাছে চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছে।’
এ বিষয়ে জেলা সিভিল সার্জন ডা. মো. মামুনুর রহমান জানান,’শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে জনবল ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির জন্য তিন থেকে চারবার লিখিত আবেদন করা হয়েছে। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে এবং ধাপে ধাপে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস পাওয়া গেছে।”
প্রসঙ্গত,গত ১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সালে ৪৮তম বিশেষ বিসিএসের মাধ্যমে স্বাস্থ্য ক্যাডারে ৩ হাজার ২৬৩ জন নতুন চিকিৎসক যোগদান করেছেন। এর মধ্যে ২ হাজার ৯৮৪ জন সহকারী সার্জন এবং ২৭৯ জন সহকারী ডেন্টাল সার্জন রয়েছেন। প্রশাসন চাইলে কম চাপযুক্ত হাসপাতাল থেকে চিকিৎসক বা নার্স সাময়িকভাবে শ্রীমঙ্গলে পদায়ন করতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে,বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী ৫০ শয্যার একটি হাসপাতাল পরিচালনার জন্য অন্তত ৮ থেকে ১২ জন চিকিৎসক,১৫ থেকে ২০ জন নার্স বা মিডওয়াইফ,২ থেকে ৩ জন ল্যাব টেকনিশিয়ান, ২ জন ফার্মাসিস্ট,১ থেকে ২ জন রেডিওগ্রাফার এবং ১৫ থেকে ২৫ জন সহায়ক কর্মী প্রয়োজন।
তবে বাস্তবে শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সেই মানদণ্ডের তুলনায় জনবল অনেক কম। দ্রুত প্রয়োজনীয় জনবল ও যন্ত্রপাতি সরবরাহ করা না হলে এই গুরুত্বপূর্ণ হাসপাতালের স্বাস্থ্যসেবা আরও সংকটের মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।

