সত্যজিৎ দাস (মৌলভীবাজার প্রতিনিধি):
বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ছোট্ট শহর শ্রীমঙ্গল যেন প্রকৃতির আঁচলে লুকানো এক অনবদ্য সবুজ স্বর্গ। পাহাড়ি টিলা, লালচে মাটির আঁকাবাঁকা পথ আর বিস্তীর্ণ চা বাগানের সমারোহ এই অঞ্চলকে দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটনগন্তব্যে পরিণত করেছে।
ভোরের প্রথম আলো উঠতেই কুয়াশায় মোড়া বাগানগুলো নতুন প্রাণ পায়। শিশিরভেজা চা পাতার ঝলমল আলো আর শ্রমিকদের ছন্দময় কাজের শব্দে জেগে ওঠে এই টিলাবেষ্টিত সবুজ ভুবন। দেশের গুরুত্বপূর্ণ কৃষিশিল্পের প্রতিটি ধাপেই জড়িয়ে আছে হাজারো শ্রমিকের কঠোর পরিশ্রম—যা শ্রীমঙ্গলের অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও পরিচয়ের মূল ভিত্তি।
বাংলাদেশে চা–শিল্পের সূচনা হয়েছে এই শ্রীমঙ্গলেই। ১৮৫৪ সালে ব্রিটিশ উদ্যোক্তাদের পরীক্ষামূলক চাষ এবং পরের বছর মালনীছড়া ও মধুপুরে বাণিজ্যিক উৎপাদনের সাফল্য দ্রুত ছড়িয়ে দেয় চায়ের খ্যাতি। বর্তমানে দেশের মোট ১৬৩টি চা বাগানের মধ্যে ৪০টি রয়েছে শ্রীমঙ্গলে। এখানেই অবস্থিত বাংলাদেশ টি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (বিটিআরআই) এবং ঐতিহ্যের প্রতীক চা-কন্যা ভাস্কর্য।
শতবর্ষী বৃক্ষরাজি, শীতল ছায়ামাখা পথ আর ঢেউখেলানো পাহাড়ি টিলায় শ্রীমঙ্গল গড়ে তুলেছে এক অনন্য প্রাকৃতিক ভূদৃশ্য। সকালের সোনালি রোদে সবুজ চা পাতার ঝিলমিল দৃশ্য যে কোনো ভ্রমণপিপাসুকে মুহূর্তেই বিমোহিত করে।
গারো, খাসিয়া, টিপড়া, মনিপুরীসহ বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর বসবাস শ্রীমঙ্গলকে দিয়েছে সংস্কৃতিগত বৈচিত্র্য। তাদের জীবনধারা, গান, উৎসব ও রীতিনীতি এখানকার বাগানসংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছে। পানের জুম চাষ, লেবু-আনারসের বাগান, মনিপুরী হস্তশিল্প সবই পর্যটকদের বাড়তি আকর্ষণ।
গ্র্যান্ড সুলতান, দুসাই, হারমিটেজ, টি হ্যাভেন, লেমন গার্ডেনসহ আন্তর্জাতিক মানের রিসোর্ট ও হোটেলের সমৃদ্ধ নেটওয়ার্ক শ্রীমঙ্গলকে পর্যটকদের জন্য নিরাপদ ও আরামদায়ক গন্তব্যে রূপ দিয়েছে। নিরাপত্তা নিশ্চিতে রয়েছে বিশেষ ট্যুরিস্ট থানা, র্যাব ও পুলিশের টহল।
যে সব স্থানে মিলবে ভিন্ন স্বাদের অভিজ্ঞতা-
১) লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান।
২) টি মিউজিয়াম।
৩) বাইক্কা বিল মৎস্য অভয়ারণ্য।
৪) বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন।
৫) ভাড়াউড়া,রাজঘাট ও কালীঘাট লেক।
৬) নীলকণ্ঠের বিখ্যাত সাত রঙের চা।
৭) ফুলছড়া চা বাগানের লাল পাহাড়।
৮) ব্রিটিশ আমলের ডিনস্টন সিমেট্রি।
৯) জান্নাতুল ফেরদৌস মসজিদ।
১০) নির্মাই শিববাড়ি।
১১) বাসুদেব মন্দির।
১২) কামিনী ভবন।
শীতকাল শ্রীমঙ্গল ভ্রমণের সবচেয়ে উপযুক্ত সময়- যখন কুয়াশা,পাহাড় আর সবুজের সম্মিলনে প্রকৃতি নিজেকে সাজিয়ে তোলে এক অপূর্ব শিল্পকর্মে।
চায়ের টিলায় দাঁড়ালে মনে হয় প্রকৃতিই যেন চারপাশে ছড়িয়ে দিয়েছে শান্তির ছায়া। আর সেই সৌন্দর্যের মধ্যেই ভিতরের ছোট্ট কবি বলে ওঠে–
“সবুজ টিলার নীরব বুকে
ভোর জাগে আলোয় ভাসে,
কুয়াশা সরে পাতার কোণে
শিশির ঝিলিক হাসে।
দুলে ওঠে চায়ের বাগান
হাওয়ার মৃদু সুরে,
প্রকৃতির এই সবুজ ছবি
হারায় দৃষ্টি ঘুরে।”
শ্রীমঙ্গল আজ শুধু বাংলাদেশের চা উৎপাদনের কেন্দ্রই নয়-প্রকৃতি, সংস্কৃতি, শ্রম ও শিল্পের সমন্বয়ে গড়া এক আন্তর্জাতিক মানের উদীয়মান গন্তব্য।

