উত্তর ২৪ পরগণার বসিরহাটের এক নম্বর ব্লকের সাকচুড়ার মাঠপাড়ায় এখন যেন সময় থমকে আছে। ঘরের ভেতর-বাইরে মানুষজনের আসা-যাওয়া, ফিসফাস, টিভির পর্দায় ভেসে ওঠা যুদ্ধের খবর—সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত ভারী নীরবতা। এই বাড়িরই এক কোণে বসে আছেন ইয়ারবানু বিবি। চোখদুটো লাল, হাতে মোবাইল ফোন। বারবার একই নম্বরে ডায়াল করছেন, আর একই উত্তর—“নট রিচেবল”।
তার বড় ছেলে আমির হোসেন গাজী, পুত্রবধূ ঊষা পারভীন আর তিন নাতি-নাতনি—সবাই এখন তেহরানে। আট বছর আগে ধর্মীয় পড়াশোনার উদ্দেশ্যে ইরানে পাড়ি দিয়েছিলেন আমির। তারপর সেখানেই থেকে যান। পড়াশোনা শেষ করে পড়ানো শুরু করেন। ধীরে ধীরে সংসার গুছিয়ে নেন। নিয়মিত ভিডিও কলে কথা হতো মায়ের সঙ্গে। নাতিরা হাসিমুখে দাদুকে গল্প শোনাত, দিদাকে নতুন কবিতা শোনাত। কিন্তু গত সপ্তাহের সেই শেষ ফোনকলের পর থেকে সব যেন অন্ধকার।
ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলার পর ইরানের পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি-এর মৃত্যুর খবরে পাল্টা আক্রমণের তীব্রতা বাড়ে। ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র আর ড্রোনে কেঁপে ওঠে বিভিন্ন এলাকা। সরকারি হিসেবে ৫৫৫ জনের মৃত্যুর খবর জানিয়েছে ইরানি রেড ক্রিসেন্ট। মিনাবের এক মেয়েদের স্কুলে হামলায় দেড় শতাধিক প্রাণহানির খবরও আসে। এই খবরগুলোই এখন ইয়ারবানু বিবির রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছে।
“ওরা কী অবস্থায় আছে জানি না। কিছুতেই ফোনে পাচ্ছি না। কী করব?”—কথা বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।
ছোট ছেলে সাবির গাজীও অসহায়ের মতো তাকিয়ে থাকে ফোনের স্ক্রিনে। “দু’দিন হলো যোগাযোগ করতে পারছি না। সঙ্গে তিনটে বাচ্চা রয়েছে… জানি না কী অবস্থায় আছে,”—তার গলা কেঁপে ওঠে।
পাড়ার মানুষজনও উদ্বিগ্ন। কেউ কেউ এসে খোঁজ নিচ্ছেন, কেউ সান্ত্বনা দিচ্ছেন। কিন্তু সান্ত্বনা কি আর দুশ্চিন্তা কমাতে পারে? এলাকার বাসিন্দা হাসান আলী জানান, পরিস্থিতি খারাপ হওয়ার আগে আমির নাকি দেশে ফেরার কথা ভাবছিলেন। কিন্তু টাকার অভাব ছিল। গরিব পরিবার। সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগেই যুদ্ধ এসে সব পথ বন্ধ করে দিল।
এই সংকট শুধু বসিরহাটের একটি পরিবারের নয়। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ১০,৭৬৫ জন ভারতীয় ও ভারতীয় বংশোদ্ভূত মানুষ ইরানে বসবাস করেন। প্রতিবছর বহু শিক্ষার্থী—বিশেষ করে জম্মু ও কাশ্মীর থেকে—কম খরচে ডাক্তারি পড়তে সেখানে যান। কর্মসূত্রেও অনেকে ইরানের নির্মাণ সংস্থায় কাজ করেন। এখন এই সংঘাতের আবহে তাদের অনেকেই অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন।
অন্যদিকে, বহু দশক আগে ইরান ছেড়ে ভারতে আসা প্রাক্তন ফুটবলার Jamshed Nassiri-রও আত্মীয়রা তেহরানেই আছেন। তিনি জানিয়েছেন, তার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছে, তারা আপাতত সুরক্ষিত। আশা প্রকাশ করেছেন পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতির।
কিন্তু ইয়ারবানু বিবির কাছে আশা মানে একটাই—একটা ফোনকল। ওপার থেকে ছেলের কণ্ঠস্বর। নাতির হাসি। রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগে তিনি আবার ফোনটা হাতে নেন। কাঁপা আঙুলে নম্বর টিপে বলেন, “আল্লাহ, একবার শুধু কথা বলতে দে।” বাইরে তখনও টিভিতে যুদ্ধের খবর চলছে। কিন্তু এই ছোট্ট বাড়ির ভেতর একটাই যুদ্ধ—অপেক্ষার। এক মায়ের বুকের ভেতর প্রতিটি মিনিট যেন এক একটি দীর্ঘ বছর।
তার একটাই প্রার্থনা—
ছেলে, বৌমা আর নাতি-পুতিরা যেন নিরাপদে ঘরে ফিরে আসে।

