মো:দিল,সিরাজগঞ্জ
ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে আবারও কর্মচাঞ্চল্যে ভরে উঠেছে সিরাজগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী তাঁত পল্লিগুলো। দীর্ঘদিনের মন্দা কাটিয়ে এখন ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত তাঁত বুননের শব্দে মুখর হয়ে উঠছে জেলার বিভিন্ন এলাকা।
শাড়ি তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন হাজারো তাঁতি ও শ্রমিক। তাদের হাতে তৈরি প্রতিটি শাড়িতে ফুটে উঠছে আধুনিকতা ও শৈল্পিকতার মেলবন্ধন। বাহারি নকশা ও নতুন ডিজাইনের শাড়ি তৈরিতে দিন-রাত এক করে কাজ করছেন তাঁতিরা। দীর্ঘদিন পর কাজের চাপ বাড়ায় বাড়তি আয়ের আশায় খুশি শ্রমিক ও তাঁত মালিকরা।
সিরাজগঞ্জ দীর্ঘদিন ধরেই দেশের অন্যতম বৃহৎ তাঁত শিল্পের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। বিশেষ করে সদর, বেলকুচি, শাহজাদপুর, উল্লাপাড়া ও এনায়েতপুর অঞ্চলে গড়ে উঠেছে অসংখ্য তাঁত কারখানা ও তাঁত পল্লি। ঈদ সামনে এলেই এসব এলাকায় কাজের চাপ কয়েকগুণ বেড়ে যায়। তখন দিন-রাত যেন আলাদা করে বোঝার উপায় থাকে না তাঁতিদের কাছে।
সম্প্রতি সরেজমিনে জেলার বিভিন্ন তাঁত পল্লি ঘুরে দেখা যায়, ভোরের আলো ফুটতেই শুরু হচ্ছে তাঁত বুননের কাজ। সারাদিনের কর্মব্যস্ততা শেষে রাত গভীর হওয়া পর্যন্ত চলছে শাড়ি তৈরির কাজ। তাঁত মেশিনের খটখট শব্দে মুখর হয়ে উঠছে পুরো এলাকা।
তাঁত পল্লির প্রতিটি ঘরেই যেন কর্মযজ্ঞ। কোথাও চলছে সুতা প্রস্তুত, কোথাও রং করা হচ্ছে সুতা, আবার কোথাও দক্ষ তাঁতিরা শাড়িতে ফুটিয়ে তুলছেন নান্দনিক নকশা। অনেক জায়গায় নারী শ্রমিকদেরও সমান তৎপরতা দেখা গেছে। পরিবারভিত্তিক এই শিল্পে স্বামী-স্ত্রীসহ পরিবারের অন্য সদস্যরাও কাজের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েন।
ঈদের বাজার ধরতে নতুন নতুন ডিজাইনের শাড়ি তৈরি করছেন তাঁতিরা। বর্তমানে জামদানি, সুতি জামদানি, কাতান, বেনারসি, সিল্ক, হাফসিল্কসহ বিভিন্ন ধরনের শাড়ি তৈরি হচ্ছে এসব তাঁত কারখানায়। ডিজাইনের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হচ্ছে আধুনিক প্রযুক্তি ও সৃজনশীল নকশা, যাতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ক্রেতাদের আকৃষ্ট করা যায়।
বেলকুচি তাঁত পল্লীর শ্রমিক সাইফুল ইসলাম বলেন, ঈদের সময়টা আমাদের জন্য সবচেয়ে ব্যস্ত সময়। তখন কাজের চাপ অনেক বেড়ে যায়। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কাজ করতে হয়। তবে কাজ বেশি থাকলে আয়ও একটু বেশি হয়, তাই কষ্ট হলেও ভালো লাগে। তিনি আরও বলেন, এবার অনেক নতুন ডিজাইনের শাড়ি তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে জামদানি ও কাতান শাড়ির চাহিদা বেশি। পাইকাররা এসে আগেই অর্ডার দিয়ে যাচ্ছেন।
তাঁত মালিকরা জানান, দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে পাইকারি ব্যবসায়ীরা এসে শাড়ি কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। সিরাজগঞ্জের তৈরি শাড়ি ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করা হচ্ছে। এছাড়া অনেক ক্ষেত্রে এসব শাড়ি বিদেশেও রপ্তানি করা হয়।
বেলকুচির একজন তাঁত মালিক উজ্জল অধিকারি বলেন, গত কয়েক বছর ধরে তাঁতশিল্পে মন্দাভাব চলছে। কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচ অনেক বেড়েছে। তবু ঈদকে সামনে রেখে আবার নতুন করে কাজ শুরু হয়েছে। আমরা চেষ্টা করছি ভালো মানের শাড়ি তৈরি করে বাজার ধরে রাখতে। তিনি বলেন, তাঁত শিল্পের প্রধান কাঁচামাল হলো সুতা ও রং। এগুলোর দাম যদি নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়, তাহলে এই শিল্প আবার আগের মতো ঘুরে দাঁড়াতে পারবে।
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, ঈদের সময় তাঁত শিল্পের উৎপাদন ও বিক্রি কয়েকগুণ বেড়ে যায়। ফলে জেলার অর্থনীতিতেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। হাজার হাজার শ্রমিক ও কর্মচারী এই শিল্পের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় তাদের জীবিকাও সচল থাকে।
সিরাজগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি সাইদুর রহমান বাচ্চু বলেন, সিরাজগঞ্জের তাঁত শিল্প বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্য। কিন্তু নানা সমস্যার কারণে এই শিল্প আজ অনেকটাই সংকটে রয়েছে। কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি, আধুনিক প্রযুক্তির অভাব এবং পর্যাপ্ত সরকারি সহায়তার অভাবে অনেক তাঁত কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে।
তিনি আরও বলেন, যদি সরকার এই শিল্পে বিশেষ প্রণোদনা দেয়, সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা দেয় এবং কাঁচামালের বাজার নিয়ন্ত্রণে আনে, তাহলে সিরাজগঞ্জের তাঁত শিল্প আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারবে। এতে কর্মসংস্থান বাড়বে এবং দেশের অর্থনীতিতেও বড় ভূমিকা রাখবে।
তাঁত শিল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, সিরাজগঞ্জের ৯টি উপজেলায় প্রায় ১০ লাখ মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত। জেলায় পাওয়ারলুম ও হ্যান্ডলুম মিলিয়ে প্রায় ৫ লাখ তাঁত রয়েছে। দেশের মোট তাঁতশিল্পের একটি বড় অংশই এই জেলায় অবস্থিত।
একসময় সিরাজগঞ্জের তাঁত শিল্প দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারেও সুনাম কুড়িয়েছিল। বিশেষ করে জামদানি ও কাতান শাড়ি দেশের পাশাপাশি বিদেশি ক্রেতাদের কাছেও জনপ্রিয় ছিল। তবে নানা সমস্যার কারণে সেই ঐতিহ্য কিছুটা ম্লান হয়ে গেছে।
তবুও ঈদকে কেন্দ্র করে আবারও প্রাণ ফিরে পাচ্ছে সিরাজগঞ্জের তাঁত পল্লিগুলো। তাঁতিদের হাতে তৈরি রঙিন শাড়িতে ফুটে উঠছে তাদের শ্রম, দক্ষতা ও স্বপ্নের গল্প। যদি যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতা ও সহায়তা পাওয়া যায়, তাহলে এই ঐতিহ্যবাহী শিল্প আবারও দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

