সোহাগ খন্দকার, সাঘাটা (গাইবান্ধা) প্রতিনিধি:
গাইবান্ধা সাঘাটা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স-এ কাঙ্ক্ষিত স্বাস্থ্যসেবা না মেলায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন নদীবেষ্টিত জনপদের মানুষ।
৩১ শয্যা থেকে ৫০ শয্যায় উন্নীত হলেও চিকিৎসক সংকট, অপারেশন সুবিধার অভাব, পরীক্ষা-নিরীক্ষায় সীমাবদ্ধতা ও ওষুধের ঘাটতিসহ নানা সমস্যায় বিপাকে রোগীরা।
গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলা প্রাকৃতিক বৈরিতার সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকা এক জনপদ। একদিকে প্রমত্ত যমুনা নদী, অন্যদিকে করতোয়া নদী এই দুই নদী বেষ্টিত এলাকায় প্রতিবছর ভাঙন, বন্যা ও দুর্যোগের আশঙ্কা লেগেই থাকে। যোগাযোগ ব্যবস্থা সীমিত, অধিকাংশ মানুষ নিম্ন আয়ের। এমন বাস্তবতায় সরকারি হাসপাতালই তাদের একমাত্র ভরসা।
সরেজমিনে দেখা যায়, রোগীর তুলনায় চিকিৎসক ও নার্সের সংখ্যা অপ্রতুল। বহির্বিভাগে দীর্ঘ লাইনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয় রোগীদের। অনেক সময় ওয়ার্ডে শয্যার চেয়ে রোগীর সংখ্যা বেশি থাকায় কাউকে মেঝে, কাউকে বারান্দায় থাকতে দেখা যায়।
উপজেলার ১০ ইউনিয়নের প্রায় তিন লক্ষ মানুষের চিকিৎসার একমাত্র কেন্দ্র এই হাসপাতাল। দিন আনে দিন খায় এমন পরিবারই এখানে বেশি। ফলে সরকারি সেবার ওপর তাদের নির্ভরশীলতা শতভাগ।
রোগী ও স্বজনদের অভিযোগ, হাসপাতালে প্রয়োজনীয় অনেক ওষুধ পাওয়া যায় না। চিকিৎসকরা বাইরে থেকে ওষুধ কিনতে পরামর্শ দেন। এতে অতিরিক্ত ব্যয় বহন করতে হচ্ছে দরিদ্র রোগীদের। পুরো হাসপাতালের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার দায়িত্ব পালন করছেন মাত্র একজন কর্মী, যা ৫০ শয্যার হাসপাতালের জন্য অপ্রতুল।
কচুয়া ইউনিয়নের তানজিল জানান, তার মাকে তীব্র পেটব্যথা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করা হলেও কয়েকদিন চিকিৎসার পরও অবস্থার উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি। প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার রিপোর্ট থাকা সত্ত্বেও সুনির্দিষ্টভাবে রোগ নির্ণয় করা হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি। তার ভাষ্য, ব্যথানাশক ইনজেকশন দিয়েই চিকিৎসা চালানো হয়েছে। অধিকাংশ ওষুধ বাইরে থেকে কিনতে হওয়ায় আর্থিক চাপও বেড়েছে।
পরিস্থিতির অবনতি হলে ভর্তি থাকার পাঁচ দিন পর উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে বগুড়ায় নিয়ে যেতে বাধ্য হন বলে জানান তানজিল। সেখানে নেওয়ার পর চিকিৎসায় কিছুটা অগ্রগতি দেখা যায় বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
বুরুঙ্গী গ্রামের শাহ আলম বলেন, পারিবারিক মারামারিতে তার হাত ভেঙে গেলে হাসপাতালে গিয়ে এক্স-রে করার জন্য সামনের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে পাঠানো হয়। সেখানে ২ হাজার ৮০০ টাকা খরচ করে এক্স-রে করাতে হয়েছে বলে জানান তিনি।
পদুম শহর কানিপাড়া গ্রামের সাগর অভিযোগ করেন, তার মা মাথায় গুরুতর আঘাত পেলে হাসপাতালে নেওয়া হলেও প্রয়োজনীয় প্রায় সব ওষুধ বাইরে থেকে কিনতে হয়েছে। হাসপাতালের পরিবেশ নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করে তিনি বলেন,বাথরুমের অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা হয় না।
হাসপাতালের বিভিন্ন স্থানে অপর্যাপ্ত পরিচ্ছন্নতা চোখে পড়ে। জনবল সংকটের কারণে সেবা কার্যক্রমে চাপ বাড়ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও আধুনিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় জটিল রোগীদের জেলা সদর বা অন্যত্র পাঠাতে হয়।
নদী বেষ্টিত ও দুর্যোগ প্রবণ এই জনপদের মানুষের দাবি শুধু শয্যা বৃদ্ধি নয়, প্রয়োজন পর্যাপ্ত চিকিৎসক ও নার্স নিয়োগ, আধুনিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা, জরুরি অপারেশন সুবিধা এবং প্রয়োজনীয় ওষুধের নিশ্চয়তা। তবেই দুই নদীর মাঝের সাঘাটার মানুষ পাবে কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসাসেবা।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. ইলতুতমিশ আকন্দ নয়া দিগন্ত কে বলেন, হাসপাতালে কোন কোন ওষুধ সরবরাহে আছে এবং কোনগুলো নেই তার তালিকা টানানো রয়েছে। যেসব ওষুধ সরবরাহে থাকে না, সেগুলো রোগীদের বাইরে থেকে কিনতে হয়।
এক্স-রে সেবা প্রসঙ্গে তিনি দাবি করেন, হাসপাতালে নিয়মিত এক্স-রে করা হয়।
পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বিষয়ে তিনি বলেন,বর্তমানে একজন কর্মী দিয়ে কাজ চালাতে হচ্ছে। তারপরও বড় কোনো সমস্যা চোখে পড়লে দ্রুত সমাধানের চেষ্টা করা হয়।সার্বিক পরিস্থিতির উন্নয়নে কাজ চলছে বলেও জানান তিনি।

