রোজার মাস মানেই ব্যস্ত বাজার, ভিড় আর দরদামের শব্দ। রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে প্রতিদিনের মতোই ক্রেতাদের আনাগোনা। কেউ ইফতারের জন্য ফল কিনছেন, কেউ আবার রাতের খাবারের জন্য মাংস বা সবজি খুঁজছেন। কিন্তু এই ব্যস্ততার মাঝেই অনেকের মুখে শোনা যাচ্ছে একটাই কথা—দাম আবার বেড়েছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেট, টাউন হল বাজার এবং কারওয়ান বাজার ঘুরে দেখা গেল, বাজারে মুরগির দাম আবার বেড়েছে। ব্রয়লার ও সোনালি—দুই ধরনের মুরগির দামই কেজিতে প্রায় ৩০ টাকা বেড়েছে। ফলে ব্রয়লার মুরগির দাম আবার ২০০ টাকার কাছাকাছি পৌঁছেছে।
বিক্রেতারা বলছেন, রোজার শুরুতে প্রায় দুই সপ্তাহ আগে ব্রয়লার মুরগির দাম কেজিতে ৪০ থেকে ৫০ টাকা বেড়ে ২০০–২২০ টাকায় উঠেছিল। কয়েক দিন পর তা কিছুটা কমে যায়। গত সপ্তাহে প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি ১৬০–১৭০ টাকায় বিক্রি হয়েছিল। কিন্তু রোজার মাঝামাঝি এসে আবার দাম বাড়তে শুরু করেছে। গতকাল বাজারে প্রতি কেজি ব্রয়লার বিক্রি হয়েছে ১৯০ থেকে ২০০ টাকায়।
সোনালি মুরগির দামও কম বাড়েনি। গতকাল মানভেদে প্রতি কেজি সোনালি মুরগি বিক্রি হয়েছে ৩০০ থেকে ৩৩০ টাকায়, যা এক সপ্তাহ আগে ছিল ২৭০ থেকে ৩০০ টাকা। তবে ডিমের বাজার এখনো স্থির আছে। প্রতি ডজন ডিম বিক্রি হচ্ছে ১০০ থেকে ১১০ টাকায়।
মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেট–এর মুরগি বিক্রেতা মুরাদ হোসেন বলেন, শীতের সময় অনেক খামারে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মুরগি মারা যাওয়ায় বাজারে কিছুটা সরবরাহ সংকট তৈরি হয়েছে। এর সঙ্গে রোজার মাসে মুরগির চাহিদাও বেড়েছে। তাঁর ধারণা, ঈদ ঘনিয়ে এলে দাম আরও কিছুটা বাড়তে পারে।
মুরগির পাশাপাশি চিনির দামও বেড়েছে। এখন রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে খোলা চিনি প্রতি কেজি ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যেখানে তিন সপ্তাহ আগেও দাম ছিল প্রায় ৯০ টাকা। মোড়কজাত চিনির দামও বেড়ে কেজিতে ১০৫ টাকা হয়েছে। বিক্রেতারা জানান, পাইকারি বাজারে প্রতি বস্তা (৫০ কেজি) চিনির দাম ৩০০ টাকা বেড়েছে।
পোলাওয়ের জন্য জনপ্রিয় চিনিগুঁড়া চালের দামও অনেক বেড়েছে। এরফান ও মোজাম্মেল ব্র্যান্ডের খোলা চিনিগুঁড়া চাল এখন কেজি ১৪০ থেকে ১৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আর মোড়কজাত চিনিগুঁড়া চালের দাম আরও বেশি—কেজি ১৭৫ থেকে ১৮৫ টাকা। অথচ মাত্র এক মাস আগেও এই চাল ৫০ থেকে ৬০ টাকা কমে পাওয়া যেত।
ঈদ সামনে রেখে মসলার বাজারেও বেড়েছে দাম। আলুবোখারার কেজি ৭৫০ টাকা থেকে বেড়ে এখন ১,০০০ টাকায় উঠেছে। জিরা ও কিশমিশের দাম কেজিতে প্রায় ৪০ টাকা বেড়েছে। কাঠবাদাম ও কাজুবাদামের দামও কেজিতে প্রায় ১০০ টাকা বেড়েছে।
এদিকে কয়েক দিন ধরে বাজারে বোতলজাত সয়াবিন তেলের সরবরাহ কমে গেছে। দাম না বাড়লেও অনেক দোকানে এক লিটার বা দুই লিটারের বোতল পাওয়া যাচ্ছে না। ইমাম হাসান পাটোয়ারি, মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেট–এর এক মুদি বিক্রেতা বলেন, তেল কোম্পানির ডিলাররা কম সরবরাহ করছেন। ৫০ কার্টন তেল চাইলে মাত্র ১০–১৫ কার্টন পাওয়া যায়।
তবে বাজারে সব পণ্যের দাম যে বাড়ছে, তা নয়। রোজার শুরুতে যে লেবু, শসা ও বেগুনের দাম হঠাৎ বেড়ে গিয়েছিল, তা এখন কিছুটা কমেছে। গতকাল বাজারে প্রতি হালি লেবু বিক্রি হয়েছে ৪০ থেকে ৮০ টাকায়, যা রোজার শুরুতে ছিল ১০০ টাকার ওপরে।
শসা, বেগুন ও কাঁচা মরিচের দামও কেজিতে প্রায় ২০ টাকা করে কমেছে। এখন শসা বিক্রি হচ্ছে ৮০ থেকে ১০০ টাকা, বেগুন ৬০ থেকে ৮০ টাকা এবং কাঁচা মরিচ ১২০ থেকে ১৪০ টাকায়। পেঁয়াজের দামও কিছুটা কমেছে—এখন কেজি ৪০ থেকে ৪৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। টাউন হল বাজার–এর সবজি বিক্রেতা আল-নাহিয়ান বলেন, রোজার শুরুতে লেবু, শসা ও বেগুনের চাহিদা হঠাৎ বেড়ে গিয়েছিল। এখন চাহিদা কমে যাওয়ায় দামও কিছুটা কমেছে।
তবে বাজারের এই ওঠানামায় সবচেয়ে বেশি চাপ পড়ছে সাধারণ ক্রেতাদের ওপর। রাজধানীর ধানমন্ডির বাসিন্দা মাহফুজুর রহমান আক্ষেপ করে বলেন, তিনি কম বেতনে চাকরি করেন। মাছ ও গরুর মাংসের দাম বেশি হওয়ায় প্রায়ই মুরগি কিনে খান। কিন্তু মুরগির দাম আবার ২০০ টাকা হয়ে যাওয়ায় তাঁর মতো মানুষের জন্য সংসার চালানো আরও কঠিন হয়ে উঠছে। রোজার বাজার তাই এখন শুধু কেনাবেচার জায়গা নয়—এখানে প্রতিদিনই দেখা যাচ্ছে মানুষের হিসাব-নিকাশ, উদ্বেগ আর সংসারের টানাপোড়েনের গল্প।

