মাহফুজুর রহমান মাসুম, উজিরপুর (বরিশাল) প্রতিনিধি:
বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হাটবাজার ব্যবস্থা। যুগ যুগ ধরে এসব হাটবাজারে প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা স্বল্প খাজনা প্রদান করে জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন। কিন্তু সম্প্রতি সরকারের নতুন গেজেট অনুযায়ী পেরিফেরি খাজনা এক লাফে কয়েকগুণ বৃদ্ধি পাওয়ায় সারাদেশের ব্যবসায়ীদের মধ্যে চরম উদ্বেগ ও অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে।
২০২৫ সালের ৬ অক্টোবর ভূমি মন্ত্রণালয় কর্তৃক জারি করা হাট ও বাজার স্থাপন ও ব্যবস্থাপনা বিধিমালা ২০২৫ অনুযায়ী হাটবাজার ব্যবস্থাপনায় নতুন কাঠামো নির্ধারণ করা হয়। এই গেজেটের আওতায় পূর্বে যেখানে শূন্য দশমিক শূন্য পাঁচ শতাংশ জমির জন্য খাজনা ছিল ২৬০ টাকা, বর্তমানে তা বাড়িয়ে ৬ হাজার টাকা করা হয়েছে।

অর্থাৎ খাজনা বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় ২৩ গুণেরও বেশি, যা দেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সরকারি নীতিমালা ও প্রশাসনিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, অতীতে হাটবাজার খাজনা বৃদ্ধি সবসময় ধাপে ধাপে এবং সহনীয় পর্যায়ে করা হয়েছে। ১৯৫৯ সালের অধ্যাদেশের মাধ্যমে হাটবাজার ব্যবস্থাপনার ভিত্তি স্থাপিত হয়, যেখানে ইজারা ভিত্তিক রাজস্ব নির্ধারণ করা হতো। পরবর্তীতে ১৯৯০ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত সময়ে খাজনা ও ইজারা মূল্য ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পেলেও তা সাধারণত ৫ থেকে ১৫ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল।
২০১০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ডিসিআর পদ্ধতিতে নিয়ন্ত্রিতভাবে খাজনা আদায় করা হয়েছে এবং প্রতিবছর সামান্য হারে বৃদ্ধি করা হয়েছে, যা গড়ে ১০ থেকে ২০ শতাংশের মধ্যে ছিল। ২০২৩ সালে নতুন আইন প্রণয়নের মাধ্যমে হাটবাজার ব্যবস্থাপনার আধুনিক কাঠামো নির্ধারণ করা হলেও ২০২৫ সালের বিধিমালার মাধ্যমে হঠাৎ করে একবারেই ২৬০ টাকা থেকে ৬ হাজার টাকায় উন্নীত করায় পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
হাটবাজারের ব্যবসায়ী মোঃ জসিম উদ্দিন হাওলাদার বলেন, সরকার রাজস্ব বাড়াতে পারে, কিন্তু এক লাফে এত বৃদ্ধি আমাদের জন্য মরণফাঁদ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পেরিফেরিভুক্ত দোকান মালিক মোহাম্মদ খাইরুল আলম বলেন, আমাদের পূর্বপুরুষের সম্পত্তি অধিগ্রহণ করে সরকার লিজ দিয়েছে, এখন আবার ২০ থেকে ২৫ গুণ খাজনা চাপিয়ে দেওয়া সম্পূর্ণ অমানবিক।
ব্যবসায়ীরা জানান, তারা ইতোমধ্যে জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ঊর্ধ্বগতি, বিদ্যুৎ বিল বৃদ্ধি এবং পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে চরম চাপে রয়েছেন। এর সাথে নতুন খাজনা যুক্ত হওয়ায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। এতে অনেক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ব্যবসা ছেড়ে দিতে বাধ্য হতে পারেন এবং গ্রামীণ অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
উজিরপুর উপজেলা সহকারী কমিশনার ভূমি মহেশ্বর মন্ডল বলেন, সরকারি গেজেট অনুযায়ী খাজনা আদায় করা হচ্ছে এবং মাঠ প্রশাসন হিসেবে তারা সেই নির্দেশনা বাস্তবায়ন করছেন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলী সুজা জানান, এটি কেন্দ্রীয় নীতিমালার বিষয় এবং স্থানীয়ভাবে পরিবর্তনের সুযোগ নেই। হাটবাজার সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছেন, হঠাৎ ২৩ গুণ খাজনা বৃদ্ধি পুনর্বিবেচনা করে ধাপে ধাপে যৌক্তিক হারে নির্ধারণ করতে হবে এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য বিশেষ সহায়তা বা ছাড়ের ব্যবস্থা করতে হবে।
বাংলাদেশের হাটবাজার শুধু বাণিজ্যের কেন্দ্র নয়, এটি গ্রামীণ অর্থনীতির প্রাণ। অতীতে যেখানে খাজনা বৃদ্ধি ছিল ধীর ও সহনশীল, সেখানে বর্তমান ২৩ গুণ বৃদ্ধি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের অস্তিত্ব সংকটে ফেলেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সিদ্ধান্ত দ্রুত পুনর্বিবেচনা না করলে দেশের বৃহৎ প্রান্তিক ব্যবসায়ী শ্রেণি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
এবার হাটবাজারে পেরি ফেরি খাজনা এক লাফে ২৩ গুণ বৃদ্ধি – চরম বিপাকে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা।

