প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে আপত্তিকর ছবি ও পোস্ট শেয়ার করার অভিযোগে ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায় আজিজুল হক নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেফতারের ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশে আইনের অপব্যবহারের পুরনো বিতর্ক আবারও সামনে এসেছে। মানবাধিকার কর্মী ও আইনজীবীরা বলছেন, আইনের নাম বারবার পরিবর্তন হলেও বিনা পরোয়ানায় গ্রেফতার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপের সুযোগ থেকে যাচ্ছে।
ঘটনার প্রেক্ষাপট ও গ্রেফতার
গত ২৬শে মার্চ রাতে মুক্তাগাছার ঝনকা বাজার এলাকা থেকে আজিজুল হককে গ্রেফতার করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, তার ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পাশে একজন নারীর ছবি বসানো একটি কুরুচিপূর্ণ ফটোকার্ড শেয়ার করা হয়েছিল। এ নিয়ে স্থানীয় বিএনপি নেতা-কর্মীদের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে এবং তারা তাৎক্ষণিক বিক্ষোভ শুরু করেন।
মুক্তাগাছা থানার পুলিশ মি. হককে ৫৪ ধারায় গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে পাঠালে আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। তবে গ্রেফতারের পরদিন ২৭শে মার্চ তার বিরুদ্ধে ‘সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ’ ও ‘সন্ত্রাস দমন আইনে’ মামলা দায়ের করেন স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা মো. ফজলু।
পুলিশের ভূমিকা ও মব জাস্টিসের অভিযোগ
মামলা হওয়ার আগেই কেন গ্রেফতার করা হয়েছে—এমন প্রশ্নের জবাবে মুক্তাগাছা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. লুৎফর রহমান জানান, পোস্টটি ভাইরাল হওয়ায় এবং অপরাধ সংঘটিত হয়েছে বুঝতে পেরে তিনি ব্যবস্থা নিয়েছেন। যদিও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বিএনপির নেতা-কর্মীরা তাকে গ্রেফতারের জন্য ওসির ওপর ‘মব’ করে চাপ সৃষ্টি করেছিলেন। তবে ওসি এই চাপের বিষয়টি অস্বীকার করেছেন।
সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ ২০২৫: কী আছে নতুন আইনে?
সাইবার নিরাপত্তা আইন ২০২৩ বাতিল করে অন্তর্বর্তী সরকার সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ ২০২৫ প্রণয়ন করেছে। এই অধ্যাদেশে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন এলেও বিতর্কিত ধারাগুলো রয়ে গেছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
নতুন আইনের উল্লেখযোগ্য দিক:
বিনা পরোয়ানায় গ্রেফতার: অধ্যাদেশের ৩৫(ঘ) ধারায় পুলিশকে কোনো পরোয়ানা ছাড়াই তল্লাশি ও গ্রেফতারের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, যা নিয়ে মানবাধিকার কর্মীদের তীব্র আপত্তি রয়েছে।
বাদ পড়া ধারা: মুক্তিযুদ্ধ, শেখ মুজিবুর রহমান, জাতীয় সংগীত বা জাতীয় পতাকা নিয়ে সমালোচনার জন্য দণ্ডের বিধান (পূর্ববর্তী ২১ ধারা) বাতিল করা হয়েছে।
নতুন সংযোজন: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ব্যবহার করে অপরাধ এবং অনলাইন জুয়াকে নতুন করে অপরাধের আওতায় আনা হয়েছে।
অটো বাতিল প্রক্রিয়া: এই অধ্যাদেশটি বর্তমান জাতীয় সংসদে ৩০ দিনের মধ্যে পাস না হলে এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে।
মানবাধিকার কর্মী ও আইনজীবীদের উদ্বেগ
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী কাজী জাহেদ ইকবাল বিবিসি বাংলাকে জানান, ২০০৬ সাল থেকে চারবার এই আইনের পরিবর্তন হলেও ‘অ্যাবইউজ’ বা অপব্যবহারের সুযোগ রয়েই গেছে। তিনি মনে করেন, মতপ্রকাশ সংক্রান্ত বিষয়গুলো এই আইন থেকে পুরোপুরি সরিয়ে নেওয়া উচিত।
মানবাধিকার কর্মী নূর খান লিটন এই ঘটনাকে ‘ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনের পুনরাবৃত্তি’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন:
“বাংলাদেশে বড় অপরাধের দিকে নজর না দিয়ে ব্যক্তিবিশেষকে খুশি করতে প্রশাসনের যে অতি তৎপরতা, তা আগের মতোই রয়ে গেছে।”
রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য রুহুল কবির রিজভী এই গ্রেফতারের পক্ষে মত দিয়ে বলেন, “প্রধানমন্ত্রীকে ঘিরে একজন নারীকে নিয়ে কুরুচিপূর্ণ ছবি প্রকাশ করা অবশ্যই আইনের আওতায় আসা উচিত। কারণ তা না হলে সমাজে বিশৃঙ্খলা তৈরি হবে।” তবে তিনি স্বীকার করেন যে, নিবর্তনমূলক আইন থাকা উচিত নয়।
মুক্তাগাছার এই ঘটনাটি বর্তমানে তদন্তাধীন রয়েছে এবং অভিযুক্ত আজিজুল হক কারাগারে রয়েছেন। আইনের এই প্রয়োগটি কি ন্যায়বিচার নাকি নিছক হয়রানি, তা নিয়ে এখন সুশীল সমাজে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে।
সূত্র বিবিসি বাংলা

