রাজধানীর রাত তখন গভীর। ঘড়ির কাঁটা পেরিয়েছে রাত বারোটা। নতুন দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র একদিন পরই পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির নেমে পড়লেন রাস্তায়। গত বুধবার তিনি আইজিপি হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন, আর বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতেই তিনি বের হলেন রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকার নিরাপত্তাব্যবস্থা নিজ চোখে দেখতে।
রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে পুলিশের গাড়ি থামে একের পর এক স্পটে। তাঁর সঙ্গে ছিলেন ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)-এর ভারপ্রাপ্ত কমিশনার মো. সরওয়ার, ডিএমপির তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার মো. ইবনে মিজান এবং মোহাম্মদপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মেজবাহ উদ্দিন।
প্রথমেই তিনি যান মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পে। বহু বছরের পরিচিত নাম, নানা ঘটনার সাক্ষী এই এলাকা। এরপর মোহাম্মদপুর টাউন হল, তারপর তিন রাস্তার মোড়—প্রতিটি জায়গায় দাঁড়িয়ে তিনি কর্তব্যরত পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন, খোঁজ নেন তাঁদের দায়িত্বপালনের অবস্থা। কোথাও কড়া নির্দেশ, কোথাও উৎসাহ, কোথাও আবার নীরব পর্যবেক্ষণ।
রাত বাড়তে থাকে। প্রায় একটা নাগাদ তিনি আকস্মিকভাবে মোহাম্মদপুর থানায় প্রবেশ করেন। সেখানে অপেক্ষমাণ সাংবাদিকদের সামনে তিনি স্পষ্ট কণ্ঠে বলেন,
“নগরবাসীর নিরাপত্তায় আমি নিজেই রাস্তায় নেমে এসেছি। অপরাধী যে-ই হোক, তাদের কঠোরহস্তে দমন করা হবে। কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।”
তিনি বলেন, কিশোর গ্যাং, ছিনতাইকারী ও মাদক কারবারিদের তৎপরতায় সাধারণ মানুষ ভীত। সন্ধ্যার পর বিশেষ ব্লক রেইড চালিয়ে ছিনতাইকারী থেকে শুরু করে মাদক-সংশ্লিষ্টদের আইনের আওতায় আনার কার্যক্রম চলছে।
কথার ফাঁকে উঠে আসে তাঁর ব্যক্তিগত স্মৃতি। ১৯৮৬ সালে বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে এক আত্মীয়ের বাসায় যাওয়ার পথে মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্প এলাকায় তিনি নিজেই ছিনতাইয়ের শিকার হয়েছিলেন। সেই অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, মোহাম্মদপুর দীর্ঘদিন ধরেই অপরাধপ্রবণ এলাকা, যেখানে বিভিন্ন অবৈধ ব্যবসার বিস্তার রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, রাজধানীতে ফুটপাত দখলের পর এখন সড়কও দখল হচ্ছে, ফলে সাধারণ মানুষের চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক না থাকলে অর্থনীতি ও বিনিয়োগ—দুটিই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
পুলিশ বাহিনীর সক্ষমতা প্রসঙ্গে তিনি বাস্তবতার কথাও তুলে ধরেন—দেশে প্রায় ২০ কোটি মানুষের বিপরীতে পুলিশের সদস্যসংখ্যা মাত্র ২ লাখ ২০ হাজার। আর ঢাকা শহরে প্রায় ৪ কোটি মানুষের বসবাস। তাই নাগরিকদের আইন মেনে চলার আহ্বান জানান তিনি।
ট্রাফিক বিভাগ পুনর্গঠনের কাজ চলছে বলেও জানান আইজিপি। আসন্ন পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে ঘরমুখী মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিজে রাতে টহলে থাকার ঘোষণা দেন তিনি। তাঁর ভাষায়, “আমি রাস্তায় থাকলে সহকর্মীরাও আরও সক্রিয় থাকবে এবং আইন প্রয়োগে কঠোরতা বাড়বে।”
‘হোয়াইট-কলার’ অপরাধীদের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে জানিয়ে তিনি বলেন, মানবাধিকার লঙ্ঘন না করে প্রচলিত আইনের মধ্যেই শক্তি প্রয়োগ করা হবে। কার্যকর পুলিশিংয়ের জন্য বাহিনীর মানসিকতার পরিবর্তন জরুরি—পুলিশকে প্রকৃত অর্থে জনসেবক হিসেবে কাজ করতে হবে।
পুলিশের পোশাক পরিবর্তন প্রসঙ্গে এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে তিনি সংক্ষিপ্ত উত্তর দেন, “এটি সরকারের নজরে রয়েছে।”
গভীর রাতের সেই টহল যেন ছিল এক প্রতীকী বার্তা—দায়িত্ব নেওয়ার পরই মাঠে নামার অঙ্গীকার। শহর তখনও ঘুমিয়ে, কিন্তু নতুন আইজিপি দাঁড়িয়ে আছেন আলোকিত সড়কের ওপর, কঠোর কণ্ঠে ঘোষণা দিচ্ছেন—আইন সবার জন্য সমান।

