সত্যজিৎ দাস (মৌলভীবাজার প্রতিনিধি):
বাংলাদেশের অন্যতম দৃষ্টিনন্দন জেলা মৌলভীবাজার সবুজ পাহাড়, চা-বাগান, জলপ্রপাত ও নৃগোষ্ঠীর বৈচিত্র্যে প্রতি বছর হাজারো পর্যটককে টানে। সাতটি উপজেলায় কৃত্রিম-প্রাকৃতিক মিলিয়ে রয়েছে প্রায় শতাধিক পর্যটন কেন্দ্র,পাশাপাশি আছে প্রায় ২০০টি আধুনিক হোটেল-মোটেল ও রিসোর্ট। দেশের পর্যটন মানচিত্রে এই জেলার অবস্থান দিনদিন গুরুত্বপূর্ণ হলেও-সরকারি উদ্যোগের অভাব, অবকাঠামো দুর্বলতা ও সেবা ঘাটতি শিল্পটির অগ্রযাত্রাকে বারবার বাধাগ্রস্ত করছে।
২০০৮ সালে মৌলভীবাজারকে আনুষ্ঠানিকভাবে পর্যটন জেলা ঘোষণা করা হয়। তবে প্রায় ১৭ বছরেও সরকারি পর্যায়ে উল্লেখযোগ্য কোনো উন্নয়ন কিংবা অবকাঠামো পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়নি। জনপ্রিয় লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, হামহাম জলপ্রপাত কিংবা মাধবপুর লেক- কয়েকটি ব্যতিক্রমী স্থানে কিছু সুবিধা থাকলেও বেশিরভাগ পর্যটনকেন্দ্রই অবহেলায় পড়ে আছে।
২০১৫ সালে গ্র্যান্ড সুলতান টি রিসোর্ট অ্যান্ড গলফ চালুর পর শ্রীমঙ্গল-মৌলভীবাজার জেলায় রিসোর্ট ব্যবসায় ব্যাপক উত্থান ঘটে। বর্তমানে জেলার রিসোর্ট সংখ্যা প্রায় ২০০,যার অনেকগুলোতে আন্তর্জাতিক মানের সেবা পাওয়া যায়।
কিন্তু এর বাইরে গাইড সেবা,পরিবহন, নিরাপত্তা ও পর্যটন-সুবিধা বাড়াতে কোনো সরকারি উদ্যোগই দৃশ্যমান নয়। ফলে পর্যটন খাত বিস্তৃত হলেও সামগ্রিকভাবে শিল্পটি শক্ত ভিত গড়ে তুলতে পারছে না।
দেশি ও বিদেশি পর্যটকদের জন্য মৌলভীবাজারে যাতায়াত এখনো বড় বাধা।
১) ঢাকা–সিলেট মহাসড়কে যানজট নিয়মিত।
২) ট্রেনের টিকিট সংকট স্থায়ী সমস্যা।
৩) অনেক পর্যটনকেন্দ্রের রাস্তা এখনো অনুপযোগী বা কাঁচা।
৪) শ্রীমঙ্গল–জেলা শহর ছাড়া মানসম্মত খাবারের ব্যবস্থা নেই।
৫) পর্যটকদের জন্য বিশেষায়িত বাস বা গাড়ি সেবা নেই।
বিদেশি পর্যটকদের অভিযোগ; কয়েকটি প্রিমিয়াম রিসোর্ট ছাড়া আন্তর্জাতিক মানের সুবিধা ও নিরাপত্তা নেই,ফলে অনেকেই থাকতে অনিচ্ছুক।
পর্যটন শিল্পকে কেন্দ্র করে জেলার প্রায় ১০ হাজার পরিবারের জীবিকা নির্বাহ হয়। চা-বাগান, রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ ও ছোট-বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান স্থানীয় অর্থনীতিতে স্থায়ী প্রভাব ফেলছে। জমির দাম কয়েক বছরে ২০-৫০ হাজার টাকা থেকে বেড়ে হয়ে গেছে ৬-৭ লাখ টাকা প্রতি শতক।
ব্যবসায়ীরা বলছেন,পর্যটনের বিশাল বাজার থাকা সত্ত্বেও দুর্বল ব্যবস্থাপনায় অনেক সম্ভাবনা হাতছাড়া হচ্ছে। পর্যটক বাড়ছে না,অনেক উদ্যোক্তা হতাশায় ভুগছেন।
জেলা প্রশাসন জানিয়েছে,পর্যটন খাত উন্নয়নে সরকারকে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে-
শমশেরনগর বিমানবন্দর চালু
সড়ক প্রশস্তকরণ ও নতুন সংযোগ সড়ক
পর্যটন মিউজিয়াম নির্মাণ
ট্রেনের টিকিট সংখ্যা বৃদ্ধি
পর্যটনকেন্দ্র উন্নয়ন ও নিরাপত্তা জোরদার
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) তানভীর হোসেন জানান,শ্রীমঙ্গলে যানজট নিরসনে নতুন সড়ক নির্মাণের নির্দেশনা ইতোমধ্যে দেওয়া হয়েছে। অন্যান্য প্রস্তাবও পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়নের আশা করা হচ্ছে।
জেলার সচেতন নাগরিক ও পর্যটন খাতের
বিশেষজ্ঞদের মত; মৌলভীবাজারে প্রকৃতি, পাহাড়, জলপ্রপাত, নৃগোষ্ঠীর সংস্কৃতি ও চা-বাগানের যে সমন্বয়,তা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম সেরা পর্যটন প্যাকেজ তৈরি করার সুযোগ রাখে। শুধু প্রয়োজন-
সড়ক ও পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন,আন্তর্জাতিক মানের সেবা ও নিরাপত্তা,পর্যটকদের জন্য তথ্যকেন্দ্র,গাইড ও লজিস্টিক সুবিধা,বৈশ্বিক পর্যায়ে প্রচারণা।
এসব বাস্তবায়ন হলে মৌলভীবাজার শুধু দেশের নয়,আন্তর্জাতিক পর্যটন মানচিত্রে শক্ত অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হবে।

