সত্যজিৎ দাস (মৌলভীবাজার প্রতিনিধি):
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে মৌলভীবাজার-৪ (কমলগঞ্জ–শ্রীমঙ্গল) সংসদীয় আসন ক্রমেই রাজনৈতিক উত্তাপে সরগরম হয়ে উঠছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে,এই আসনে এখন পর্যন্ত বিএনপি তুলনামূলকভাবে এগিয়ে থাকলেও শেষ পর্যন্ত ফল নির্ধারিত হতে পারে দলটির ভেতরের দ্বিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাধ্যমেই।
চা বাগান অধ্যুষিত এ আসনটি দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগের প্রভাববলয়ে থাকলেও এবারের নির্বাচনে দলটির অনুপস্থিতি ভোটের অঙ্ককে জটিল করে তুলেছে। ফলে চা শ্রমিকদের বড় ভোটব্যাংক এখন কোনো নির্দিষ্ট দলের পক্ষে একতাবদ্ধ নয়। জয় নিশ্চিত করতে সব প্রার্থীর নজর এখন এই শ্রমজীবী ভোটারদের দিকেই।
সরেজমিনে দেখা গেছে,কমলগঞ্জ ও শ্রীমঙ্গলের প্রতিটি ইউনিয়ন,বাজার ও চা বাগানে প্রচারণা চলছে পুরোদমে। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চায়ের দোকান,ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান,সড়ক ও হাটবাজারে প্রার্থীদের সরব উপস্থিতি চোখে পড়ছে। মাইকিং,গান-বাজনা,ব্যানার ও ফেস্টুনে ছেয়ে গেছে শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত পুরো এলাকা। কনকনে শীত উপেক্ষা করেই ভোটারদের মন জয় করতে দ্বারে দ্বারে ছুটছেন প্রার্থীরা। হাটবাজারের আড্ডায় এখন একটাই আলোচ্য বিষয়-কে হচ্ছেন মৌলভীবাজার-৪ আসনের আগামী সংসদ সদস্য।
স্থানীয়দের মতে,নির্বাচনী লড়াই জমজমাট হলেও বিএনপির দলীয় প্রার্থীকে বাড়তি চাপ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। কারণ,একই দলের একজন প্রভাবশালী নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মাঠে থাকায় বিএনপির ভোট বিভক্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এতে করে দলের নেতাকর্মীদের মধ্যেও বিভেদ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
এই আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য মো. মুজিবুর রহমান চৌধুরী ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচনী মাঠে সক্রিয়। অন্যদিকে,দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে জেলা বিএনপির সদস্য ও শ্রীমঙ্গল পৌরসভার সাবেক মেয়র মহসিন মিয়া মধু স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ফুটবল প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। স্থানীয় নেতাকর্মীদের ভাষ্যে, বিএনপির দলীয় প্রার্থীর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী এখন বিএনপিরই বহিষ্কৃত নেতা মহসিন মিয়া মধু।
আওয়ামী লীগ নির্বাচনে না থাকায় ফলাফল অনুমান করা কঠিন হয়ে পড়েছে বলে মনে করছেন সচেতন ভোটাররা। এই আসনে আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন-এনসিপির প্রার্থী প্রীতম দাশ (শাপলা কলি),বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের শেখ নূরে আলম হামিদী (রিকশা), জাতীয় পার্টির মোহাম্মদ জরিফ হোসেন (লাঙল) এবং বাসদের মো. আবুল হাসান (মই)।
বিএনপির দুই প্রার্থী মুজিবুর রহমান ও মহসিন মিয়া মধুর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রভাব ইতোমধ্যে পুরো এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে। উভয় পক্ষের সমর্থকেরা নিজ নিজ অবস্থান থেকে জোর প্রচারণায় ব্যস্ত। পরিস্থিতি বিশ্লেষণে দেখা যায়, সাধারণ ভোটার ও চা শ্রমিকদের সমর্থনই শেষ পর্যন্ত জয়-পরাজয়ের চাবিকাঠি হয়ে উঠতে পারে।
সমাজ উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড,ফাউন্ডেশন পরিচালনা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার মাধ্যমে স্থানীয়দের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করছেন বিএনপির প্রার্থী মুজিবুর রহমান। অন্যদিকে,মহসিন মিয়া মধু দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় থেকে এলাকার মানুষের কাছে সহজলভ্য নেতা হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন। তবে এই দুই প্রার্থীর পাল্টাপাল্টি সমালোচনা ও দলীয় বিভেদ ভোটারদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন অনেকে।
নির্বাচনী প্রচারণাকে কেন্দ্র করে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসন সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। নিয়মিত টহল ও তদারকির মাধ্যমে নির্বাচনী আচরণবিধি বাস্তবায়নের চেষ্টা চলছে।
কমলগঞ্জ ও শ্রীমঙ্গল-এই দুই উপজেলা,দুইটি পৌরসভা ও ১৮টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত মৌলভীবাজার-৪ সংসদীয় আসনটি ২৮৩ নম্বর আসন। এখানে মোট ভোটার ৪ লাখ ৮৭ হাজার ৮৮৮ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৪৬ হাজার ১৯৭ জন,নারী ভোটার ২ লাখ ৪১ হাজার ৬৮৯ জন,তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ২ জন এবং ডাকযোগে ভোটার ২ হাজার ৩১৮ জন। দুই উপজেলায় ১৬৩টি স্থায়ী ভোটকেন্দ্রের ৯৩৯টি কক্ষে ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মৌলভীবাজার-৪ আসনে শেষ পর্যন্ত কার গলায় জয়ের মালা ওঠে-সেদিকেই এখন তাকিয়ে রয়েছে কমলগঞ্জ ও শ্রীমঙ্গলের ভোটাররা।

