সদ্য সমাপ্ত গণঅভ্যুত্থানের পর আমরা যখন একটি নতুন, বৈষম্যহীন ও ন্যায়বিচারভিত্তিক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখছি, তখন দেশের বিভিন্ন স্থানে ‘মব জাস্টিস’ বা আইন হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা আমাদের সেই স্বপ্নকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট চাঁদপুরসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় উন্মত্ত জনতার হাতে প্রাণ হারিয়েছেন পুলিশ সদস্য থেকে শুরু করে রাজনৈতিক ব্যক্তি ও সাধারণ মানুষ। প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে কাউকে পিটিয়ে হত্যা করা কেবল একটি অপরাধই নয়, বরং এটি মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন এবং একটি সভ্য সমাজের জন্য অশনিসংকেত।
মানবাধিকারের চিরন্তন নীতি হলো— “দোষী সাব্যস্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত প্রত্যেকেই নিরপরাধ।” কোনো ব্যক্তি যদি গুরুতর অপরাধও করে থাকেন, তবে তাকে প্রচলিত আইনের আওতায় এনে সুষ্ঠু বিচারের মুখোমুখি করাই হলো ন্যায়বিচারের দাবি। কিন্তু যখন একদল মানুষ আবেগপ্রবণ বা প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে কাউকে পিটিয়ে মেরে ফেলে, তখন সেখানে আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনো সুযোগ থাকে না। এতে যেমন অনেক সময় নিরপরাধ মানুষ প্রাণ হারান, তেমনি প্রকৃত অপরাধীও অনেক তথ্য ও আইনি প্রক্রিয়া এড়িয়ে চলে যাওয়ার সুযোগ পায়।
৫ই আগস্ট কচুয়া থানায় যে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে, যেখানে একজন পুলিশ সদস্যকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে, সেটি আমাদের বিচারহীনতার সংস্কৃতির একটি ভয়াবহ রূপ। আমরা যদি ক্ষোভ মেটানোর জন্য আইনকে নিজের হাতে তুলে নিই, তবে আদালত, সংবিধান এবং বিচার ব্যবস্থার আর কোনো কার্যকারিতা থাকে না। এটি সমাজকে অরাজকতার (Anarchy) দিকে ঠেলে দেয়, যেখানে কেউ নিরাপদ নয়। আজ যাকে অপরাধী ভেবে মব জাস্টিস করা হচ্ছে, কাল যে আপনি বা আমি এর শিকার হব না, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।
ইসলামসহ কোনো ধর্মই বিনা বিচারে বা ব্যক্তিগত আক্রোশে মানুষ হত্যার অনুমতি দেয় না। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, “যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করল, সে যেন পুরো মানবজাতিকেই হত্যা করল।” সুতরাং মব জাস্টিস কেবল আইনি অপরাধ নয়, বরং এটি একটি নৈতিক ও ধর্মীয় স্খলনও বটে।
এই পরিস্থিতি উত্তরণে আমাদের তিনটি পদক্ষেপ জরুরি:
১. আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কার্যকারিতা: পুলিশ ও প্রশাসনকে দ্রুত পূর্ণ শক্তিতে সক্রিয় হতে হবে যেন সাধারণ মানুষ নিরাপত্তার অভাব বোধ না করে এবং আইন হাতে তুলে নেওয়ার দুঃসাহস না পায়।
২. দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা: পূর্ববর্তী সময়ের বিচারহীনতার সংস্কৃতিই মানুষকে আইন নিজের হাতে তুলে নিতে উৎসাহিত করেছে। তাই প্রতিটি অপরাধের বিচার স্বচ্ছ ও দ্রুত প্রক্রিয়ায় নিশ্চিত করতে হবে।
৩. সামাজিক প্রতিরোধ: স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, ইমাম এবং শিক্ষিত সমাজকে এগিয়ে আসতে হবে। পাড়ায় পাড়ায় সচেতনতা তৈরি করতে হবে যে, প্রতিহিংসা কোনো সমাধান নয়।
আমরা প্রতিহিংসার বাংলাদেশ চাই না, আমরা চাই আইনের শাসনের বাংলাদেশ। আসুন, আমরা উত্তেজিত না হয়ে বিবেকবান হই। কোনো অপরাধীকে দেখলে তাকে পিটিয়ে হত্যা না করে প্রশাসনের হাতে তুলে দিই। মনে রাখবেন, একটি খুনের বদলা নিতে গিয়ে আরেকটি খুনের ভাগীদার হওয়া কখনোই বিপ্লবের লক্ষ্য হতে পারে না।
আসুন, আমরা সম্মিলিতভাবে মব জাস্টিসকে ‘না’ বলি এবং একটি প্রকৃত ন্যায়বিচারভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনে ভূমিকা রাখি।
লেখক:
মো. রুবেল মিয়া
মানবাধিকার কর্মী।

