সুলতান মাহমুদ, দিনাজপুর প্রতিনিধি:
দিনাজপুরের বীরগঞ্জে নিউ একতা ক্লিনিকে সিজার অপারেশনের পর প্রসূতির মৃত্যুর ঘটনায় চিকিৎসায় অবহেলার প্রাথমিক প্রমাণ পেয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। এ ঘটনায় দুই চিকিৎসক ও ক্লিনিক মালিকসহ তিনজনের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে।
শনিবার পিবিআইয়ের তদন্ত কর্মকর্তা মোঃ মোস্তাফিজুর রহমান স্বাক্ষরিত একটি তদন্ত প্রতিবেদন দিনাজপুর আদালতে দাখিল করা হয়েছে। প্রতিবেদনে দণ্ডবিধি ১৮৬০-এর ৩০৪-ক (অবহেলাজনিত মৃত্যু) ধারায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রাথমিকভাবে সত্য বলে উল্লেখ করা হয়।
মামলার সূত্রে জানা যায়, গত ২০ জুন ২০২৫ তারিখে বীরগঞ্জ উপজেলার ঠাকুরগাঁও বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অবস্থিত নিউ একতা ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারে প্রসূতি আশা মনি রায় (২০)-এর সিজার অপারেশন করা হয়। অপারেশনের কিছু সময় পরই তার শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। পরে তাকে দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে সেদিন রাতেই তার মৃত্যু হয়।
ঘটনাটি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। বিক্ষুব্ধ জনতা ক্লিনিকটি ঘেরাও করলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী হস্তক্ষেপ করে।
লিখিত অভিযোগ না থাকলেও প্রকাশিত সংবাদের ভিত্তিতে বীরগঞ্জ আমলী আদালত স্বপ্রণোদিত হয়ে ফৌজদারি কার্যবিধি ১৮৯৮-এর ১৯০(১)(গ) ধারায় মামলাটি আমলে নেয় এবং তদন্তের দায়িত্ব পিবিআইকে প্রদান করে।
পিবিআইয়ের তদন্তে উঠে আসে, ভুক্তভোগী আশা মনি রায় দীর্ঘদিন ধরে গাইনি বিশেষজ্ঞ ডা. ইয়াসমিন ইসলামের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসাধীন ছিলেন। ঘটনার দিন তাকে নিউ একতা ক্লিনিকে ভর্তি করে সিজার অপারেশন করা হয়। তবে অপারেশনের পর রোগীর যথাযথ পর্যবেক্ষণ ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করা হয়নি।
তদন্তে আরও জানা যায়, অপারেশনের পর রোগীর তদারকিতে কোনো অভিজ্ঞ এমবিবিএস চিকিৎসক নিয়োজিত ছিল না। বরং ডিপ্লোমাধারী চিকিৎসা সহকারী মোঃ মনির হোসেন (ডিএমএফ)-এর মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ পোস্ট-অপারেটিভ পর্যবেক্ষণ পরিচালনা করা হচ্ছিল, যা প্রচলিত চিকিৎসা নীতিমালার পরিপন্থী। এছাড়া ক্লিনিকটিতে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম ও জরুরি সেবা প্রদানের সক্ষমতারও ঘাটতি ছিল।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ক্লিনিকটির লাইসেন্স নবায়ন না থাকা সত্ত্বেও সেখানে নিয়মবহির্ভূতভাবে সিজারসহ জটিল চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছিল। অপারেশনের পর রোগীর অবস্থার অবনতি হলেও তাৎক্ষণিক কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, যা শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
তদন্তে অভিযুক্ত হিসেবে ডা. ইয়াসমিন ইসলাম (৩৭) তিনি দিনাজপুর জেলার কাহারোল উপজেলার পূর্ব সাদীপুর দশ মাইল এলাকার নুরুল ইসলামের কন্যা। তিনি বর্তমানে দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কর্মরত রয়েছেন। ডা. মোঃ মনজুরুল আহসান কাজল (৩৬)। তিনি পঞ্চগড় জেলা সদরের বদিনাজত গ্রামের আফসারুল হকের ছেলে। তিনিও দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কর্মরত রয়েছেন। এবং ক্লিনিক মালিক মোঃ রেজাউল করিম রিপন (৫০)- দিনাজপুর জেলার বীরগঞ্জ উপজেলার ভোগনগর সরকার পাড়া গ্রামের তৈবুল ইসলামের ছেলে।
দিনাজপুর পিবিআইয়ের তদন্ত কর্মকর্তা মোঃ মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “তদন্তে প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত ও সাক্ষ্য-প্রমাণে স্পষ্ট হয়েছে যে, ডায়াগনস্টিক সেন্টারটিতে নিয়মবহির্ভূতভাবে চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছিল। নিবন্ধিত চিকিৎসকের পরিবর্তে চিকিৎসা সহকারী দিয়ে রোগীদের সেবা দেওয়া হয়েছে, যা আইন ও নীতিমালার পরিপন্থী।
তিনি আরও বলেন, অস্ত্রোপচারের পর রোগীর যথাযথ মনিটরিং ও চিকিৎসা মূল্যায়নের ঘাটতি ছিল। প্রয়োজনীয় জনবল ও সরঞ্জামের অভাবে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়নি। এর ফলেই রোগীর মৃত্যু ঘটে।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, অভিযুক্ত দুই চিকিৎসক ক্লিনিকের অব্যবস্থাপনা সম্পর্কে অবগত থাকা সত্ত্বেও ঝুঁকিপূর্ণ অস্ত্রোপচার পরিচালনা করেন, যা দায়িত্বহীনতার শামিল।
দিনাজপুর পিবিআই জানায়, গোপন ও প্রকাশ্য তদন্ত, সাক্ষীদের জবানবন্দি এবং সংগৃহীত প্রমাণাদি বিশ্লেষণে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, যথাযথ চিকিৎসা সেবা না পাওয়ায় প্রসূতি আশা মনি রায়ের মৃত্যু হয়েছে।
তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, “উপস্থাপিত তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রাথমিকভাবে সত্য প্রমাণিত হয়েছে। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে।
দিনাজপুর জজ কোর্ট আইনজীবী অ্যাডভোকেট ইন্দ্রজিৎ কুমার রায় বলেন, ব্যাঙের ছাতার মতো জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার স্থাপন করে সাধারণ মানুষের জীবন নিয়ে তারা খেলা করছে। অনেক ক্লিনিকের মেডিকেল অফিসারসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নেই। প্রতিনিয়তই কোন না কোন ক্লিনিকে প্রসূতি মায়ের মৃত্যুর খবর আমরা পাই। বীরগঞ্জের নিউ একতা ক্লিনিকের এক প্রসূতি মায়ের মৃত্যুর প্রতিবেদন পুলিশ আদালতে দাখিল করেছেন আমরা অবশ্যই এর সুষ্ঠু বিচার দাবি করছি।

