আবু জাফর বিশ্বাস, বরিশাল প্রতিনিধি:
২ মার্চ—ঝালকাঠির কুলকাঠি গ্রামের ইতিহাসে এক শোকাবহ দিন। ১৯২৭ সালের এই দিনে ব্রিটিশ শাসনামলে তৎকালীন বাকেরগঞ্জ জেলার নলছিটি থানার কুলকাঠি গ্রামে সংঘটিত হয় এক মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড, যা ইতিহাসে “কুলকাঠি হত্যাকাণ্ড” বা “পোনাবালিয়া রায়ট” নামে পরিচিত। সমসাময়িক বিভিন্ন পত্রিকায় ঘটনাটিকে ‘দ্বিতীয় জালিয়ানওয়ালাবাগ’ হিসেবেও উল্লেখ করা হয়।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ঝালকাঠি শহরের পাশ দিয়ে প্রবাহিত সুগন্ধা নদীর দক্ষিণ তীরে অবস্থিত পোনাবালিয়া ও কুলকাঠি এলাকায় শিবচতুর্দশী উপলক্ষে ঐতিহ্যবাহী শিববাড়ি মেলা অনুষ্ঠিত হতো। ১৯২৬ সালে কুলকাঠি গ্রামে একটি জামে মসজিদ নির্মাণের পর মেলাগামীদের বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে মসজিদের পাশের রাস্তা দিয়ে যাতায়াতকে কেন্দ্র করে মুসলিম ও হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হয়।

মসজিদের ইমাম মৌলভী সৈয়দ উদ্দিনের নেতৃত্বে মুসল্লিরা বিষয়টি নিয়ে আপত্তি জানালেও সমাধান হয়নি। ২ মার্চ সকালে কয়েক হাজার হিন্দু ভক্ত বাদ্যযন্ত্রসহ শিবমন্দিরের উদ্দেশ্যে রওনা দিলে মুসলমানরা বাধা দেন। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে তৎকালীন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ই.এন. ব্লান্ডি গুর্খা বাহিনীসহ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন। একপর্যায়ে উত্তেজনা চরমে পৌঁছালে ম্যাজিস্ট্রেটের নির্দেশে গুর্খা সৈন্যরা গুলি চালায়।
ঘটনাস্থলেই ১৯ জন মুসল্লি নিহত হন এবং অনেকে আহত হন। নিহতদের মরদেহ বরিশালে ময়নাতদন্ত শেষে জানাজা সম্পন্ন করে নিজ গ্রামে দাফন করা হয়। পুরো বাকেরগঞ্জ জেলাসহ দেশজুড়ে শোকের ছায়া নেমে আসে এবং প্রতিবাদের ঝড় ওঠে।
প্রখ্যাত রাজনৈতিক নেতা এ. কে. ফজলুল হক ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে তীব্র নিন্দা জানান। পরবর্তীতে নিহত পরিবারগুলোর জন্য জমি বরাদ্দ, কবরস্থানের চারদিকে দেয়াল নির্মাণ এবং মসজিদের উন্নয়নসহ কিছু প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় বলে জানা যায়।
ঐতিহাসিকদের মতে, কুলকাঠি হত্যাকাণ্ড ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের কঠোরতা ও তৎকালীন সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার এক বেদনাবহ দৃষ্টান্ত। স্থানীয়ভাবে ১৯ শহীদের স্মৃতি আজও গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করা হয়।

