মো: গোলাম কিবরিয়া, রাজশাহী জেলা প্রতিনিধি :
রাজশাহী সিটি করপোরেশনের মালিকানাধীন উত্তরবঙ্গের বৃহৎ পশুহাট রাজশাহী সিটি প্রাত্যহিক পশু হাট ইজারায় গুরুতর ঘাপলার অভিযোগ উঠেছে। গত বছর রাজশাহী সিটি পশুহাট ইজারা হয়েছিল ১২ কোটি টাকায়। বিভিন্ন পার্টি ও সিন্ডিকেটকে ম্যানেজ করতে গিয়ে ইজারাদারের খরচ হয়েছিল প্রায় ১৪ কোটি টাকার বেশি।
অভিযোগ উঠেছে এবার পাঁচ কোটি টাকা কমে ৭ কোটি ৪০ লাখ টাকায় ইজারা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সিন্ডিকেট করে হাটটি পাঁচ কোটি টাকা কম ইজারামূল্যে নিতে যাচ্ছে একটি বিশেষ মহল। কম মূল্যে ইজারা দেওয়ায় রাসিকের প্রায় ৭ কোটি টাকা রাজস্ব ক্ষতি হবে।
অভিযোগ উঠেছে, রাজশাহী সিটি করপোরেশনের হাট বাজার ইজারা কমিটিও এই সিন্ডিকেটে সামিল হয়েছেন। এই সিন্ডিকেটে আছেন রাজশাহীর আওয়ামী লীগ বিএনপি ঘনিষ্ঠ সুবিধাভোগী ঘাটিয়াল ও হাটিয়ালরা। এই হাট ইজারা সিন্ডিকেটের পেছনে বহুল আলোচিত রাজশাহীর হুন্ডি ব্যবসায়ীখ্যাত হুন্ডি মুকুল কলকাঠি নেড়েছেন বলে জানা গেছে। হুন্ডি মুকুলই সব টাকার জোগান দিচ্ছেন বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। মুকুল গত আওয়ামী লীগ সরকারের সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী।
রাসিকের কর্মকর্তা কর্মচারীরা জানিয়েছেন, সিটি হাটের সম্ভাব্য সরকারি মূল্য নির্ধারণে কারসাজির আশ্রয় নিয়েছে রাসিকের ইজারা কমিটি। কারসাজি মূল্যে ইজারা চূড়ান্ত হওয়ায় রাজশাহী সিটি করপোরেশন প্রায় পাঁচ কোটি টাকা রাজস্ব হারাবে।
হাট ইজারা কমিটির সভাপতি রাসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রেজাউল করিম এ বিষয়ে মুখে কুলুপ এঁটেছেন। ইজারা সংক্রান্ত কোনো তথ্যই সে প্রকাশ করতে অস্বীকার করেছেন। রাজশাহীতে অবস্থান করলেও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা তার দপ্তরের লোকজনকে বলে দিয়েছেন কেউ আসলে বলবেন চিফ ঢাকায় অবস্থান করছেন। কোনো সাংবাদিকের কাছে যেন কোনো তথ্য প্রকাশ না করা হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত ২৩ ফেব্রুয়ারি রাজশাহীর প্রাত্যহিক সিটি পশুহাটসহ ১৪টি হাট বাজারের দরপত্র বিজ্ঞপ্তি জারি করেন রাসিকের সচিব। সম্ভাব্য মূল্য ধরা হয় ৭ কোটি ৩ লাখ ৮৪ হাজার ২৭৫ টাকা। গত ১১ মার্চ ছিল দরপত্র দাখিলের শেষ দিন। এ দিন সিটিহাটের ইজারায় ১৫টি সিডিউল বিক্রি হয়। তবে গত ১২ মার্চ দরপত্র দাখিলের শেষদিনে মাত্র পাঁচটি দরপত্র জমা করা হয়। হাট ইজারায় একটি বিশেষ সিন্ডিকেট ইজারা কমিটির সঙ্গে যোগসাজশ করে মাত্র পাঁচটি দরপত্র দাখিল করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এর মধ্যে সর্বোচ্চ দরদাতা হন জনৈক শওকত আলী। তিনি এবার ইজারা মূল্য দিয়েছেন ৭ কোটি ৪০ লাখ টাকা। ইজারা কমিটি দরপত্র খুলে তাকেই আগামী এক বছরের জন্য রাজশাহী সিটি পশুহাট ইজারা প্রদানের সুপারিশ করেন। এই শওকত আলী আলোচিত হুন্ডি মুকুলের বেয়াই।
হুন্ডি মুকুলের বিরুদ্ধে জুলাই আন্দোলনে ছাত্র-জনতার ওপর হামলায় মদদদানের অভিযোগে পাঁচটি মামলা রয়েছে। সম্প্রতি জামিনে বেরিয়ে মুকুল রাজশাহী অঞ্চলের অধিকাংশ হাটঘাট ইজারা নিতে তৈরি করেছে শক্তিশালী সিন্ডিকেট।
খোঁজ নিয়ে আরও জানা গেছে, গত বছর এই শওকত আলী সিটি হাট ভ্যাট-ট্যাক্সসহ ইজারা নিয়েছিল ১২ কোটি ৮৬ লাখ ২৩৪ টাকা। ইজারা নীতিমালা অনুযায়ী গত বছরের ইজারামূল্যের সঙ্গে ১০ শতাংশ অতিরিক্ত মূল্য যোগ হয়ে চলতি বছরের সম্ভাব্য ইজারামূল্য নির্ধারণ হওয়ার কথা; কিন্তু ইজারা কমিটি রহস্যজনকভাবে গত বছরের চেয়ে ৫ কোটি টাকা কমিয়ে সম্ভাব্য ইজারা মূল্য নির্ধারণ ও ইজারা দরপত্র আহ্বান করেন। ইজারা সিন্ডিকেটটে সুবিধা পাইয়ে দিতেই এমন অভিনব মূল্য কারসাজি করা হয়েছে বলে রাসিকের কর্মকর্তা কর্মচারী ছাড়াও ইজারায় আগ্রহী ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন।
জানা গেছে, গত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ওই সময়ে সরকারের ঘনিষ্ঠ লোকেরা সিটি হাটটি মূল্য কারসাজি করে গোপনে কম মূল্যে ইজারা নিতেন। কাউকে ইজারা দরপত্রে অংশ নিতে দেওয়া হতো না। একই ধারাবাহিকতায় এবারও একই কায়দায় সিটি হাট ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়া চূড়ান্ত হয়েছে বলে অভিযোগে জানা গেছে। তবে ঘুরেফিরে আওয়ামী লীগের সুবিধাভোগী সিন্ডিকেটই এবারও সিটি হাটের ইজারা নিচ্ছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে গত বছরের ইজারাদার শওকত আলী জানান, গত বছর তিনি ৭ কোটি ৮০ লাখ টাকায় সিটি পশু হাট ইজারা নিয়েছিলেন। ভ্যাট ট্যাক্স ও বিভিন্ন পার্টিকে ম্যানেজ করে হাট নিতে তার প্রায় ১৪ কোটি টাকা খরচ হয়েছিল। এবার তিনি ৭ কোটি ৪০ লাখ টাকা দর দিয়েছিলেন। তার দরটাই সর্বোচ্চ বিবেচিত হয়েছে। ফলে তাকে সিটি হাট ইজারা দেওয়া হবে বলে তিনি নিশ্চিত হয়েছেন। তবে এই ইজারা মূল্যের সঙ্গে আরও কিছু খরচ আছে বলে জানান তিনি।
এছাড়া সিটি করপোরেশনের অন্যান্য হাটবাজার ইজারাতেও গুরুতর অনিয়মের ঘটনা ঘটেছে বলে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ও রাজশাহীর বিভাগীয় কমিশনার (অতিরিক্ত সচিব) আনম বজলুর রশীদ জানান, গত তিন বছরের সম্ভাব্য সরকারি গড় মূল্যের মধ্যে যেটি বেশি সেটাকেই এ বছর সম্ভাব্য মূল্য হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এটা ইজারা নীতিমালা অনুযায়ী করা হয়েছে। যারা সিডিউল উত্তোলন করেছিলেন তারা যদি বাইরে নেগোসিয়েশান করে নেন তখন অফিসের কিছু করার থাকে না। এবার ১৫ সিডিউল উঠলেও শেষদিনে মাত্র পাঁচজন জমা করেছেন। এর মধ্যে যার দরটি সর্বোচ্চ তাকেই ইজারা দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। তবে এখনো কার্যাদেশ দেওয়া হয়নি।
ইজারা কমিটির সভাপতি রাসিকের প্রধান নির্বাহী রেজাউল করিমের রহস্যজনক আচরণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, হয়তো দাপ্তরিক কোনো কাজে ব্যস্ত আছেন। নিয়মের বাইরে কেউ কিছু করতে পারবে না।

