নাজমুল হোসেন, ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি:
রাজা টংকনাথ এর রাজবাড়ী ঠাকুরগাঁও জেলার একটি উল্লেখযোগ্য পর্যটন কেন্দ্র ও ঐতিহাসিক নিদর্শন। এর চারপাশের মনোরম গ্রামীণ পরিবেশ এবং শান্ত আবহাওয়া পর্যটকদের আকৃষ্ট করে তোলে। প্রতিবছর দেশের বিভিন্ন বিভাগ জেলা থেকে দর্শনার্থীরা এই ঐতিহাসিক রাজবাড়ীটি পরিদর্শনের জন্য আসেন। প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব বিবেচনায় বর্তমানে এটি একটি সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে পরিচিত।
এটি ঠাকুরগাঁও জেলা শহর থেকে প্রায় ৪৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত হলেও।
রাণীশংকৈল উপজেলার পৌর শহর থেকে মাত্র ১.৩ কিলোমিটার পূর্বে বাচোর ইউনিয়নের কুলিক নদীর তীর ঘেঁষা প্রায় ১০ একর জমির ওপর রাজা টংকনাথের রাজবাড়িটি অবস্থিত। উপজেলা শহর থেকে মাত্র ১০ টাকা দিয়ে ভ্যান, কিংবা ব্যাটারি চালিত অটো যোগে পৌঁছা যাওয়া যায় রাজা টংকনাথের রাজবাড়িতে। রাজবাড়িরটির নির্মাণ শৈলী অপরুপ কারুকার্যময় বেস্টিত। রাজবাড়ির মেঝে ছিল মার্বেল পাথরের তৈরি। এক সময়ের জাঁকজমকপূর্ণ কারুকার্জে খচিত প্রাচীন এই রাজভবনটিতে এখনো অনেক কারুকাজ করা দেয়াল অবশিষ্ট আছে সেই সাথে রয়েছে বিশাল আকৃতির মোটা ধরনের রেলপথের লোহার সড়। রাজবাড়িটির ভিতরের পূর্ব পাশে একটি অন্ধরমহল রয়েছে।

রাজবাড়ির পশ্চিমদিকে রয়েছে সিংহদরজা। অপরপ্রান্তে দুটি দীঘি রয়েছে। বিশাল এক সিংহ দরজা দিয়ে রাজবাড়ির ভেতরে প্রবেশ করতে হয়। রাজবাড়িসংলগ্ন উত্তর-পূর্ব কোণে রয়েছে কাছারিবাড়ি। লাল রঙের দালানটি স্থাপত্যশৈলীতে আধুনিকতার পাশাপাশি ভিক্টোরিয়ান অলঙ্করণের ছাপ সুস্পষ্ট। উনবিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগে রাজবাড়িটি নির্মিত হয়। রাজা টংকনাথের পিতা বুদ্ধিনাথের আমলেই রাজবাড়ি নির্মাণ কাজ শুরু হয়। বুদ্ধিনাথের মৃত্যুর পরে রাজা টংকনাথ রাজবাড়ির অসমাপ্ত কাজ শেষ করেন।
ইতিহাস থেকে জানা যায়, রাজা টংকনাথের পূর্ব-পুরুষদের কেউ জমিদার ছিলেন না। বর্তমানে রাণীশংকৈল উপজেলা শহর হতে ৭ কিলোমিটার পূর্বে কাতিহার নামক জায়গায় গোয়ালা বংশীয় নিঃসন্তান এক জমিদার বাস করতেন। জমিদারের মন্দিরে সেবায়েত হিসেবে কাজ করতেন টংকনাথের পিতা বুদ্ধিনাথ। গোয়ালা জমিদার ভারত এর কাশি যাওয়ার সময় তাম্রপাতে দলিল করে যান যে, তিনি ফিরে না এলে মন্দিরের সেবায়েত বুদ্ধিনাথ জমিদারির মালিক হবেন। গোয়ালা জমিদার ফিরে না আসায় বুদ্ধিনাথ জমিদারির মালিক হন।
তবে অনেকে মনে করেন এই ঘটনা বুদ্ধিনাথ দু-এক পুরুষ পূর্বেরও হতে পারে। রাজা টংকনাথ চৌধুরী খুব বড় মাপের জমিদার না হলেও তার আভিজাত্যের কমতি ছিল না। জমিদার বুদ্ধিনাথের দ্বিতীয় ছেলে টংকনাথ তৎকালীন ব্রিটিশ সরকারের আস্থা অর্জন করার জন্য মালদুয়ার স্টেট গঠন করেন। বিভিন্ন সময় সমাজসেবামূলক কাজের জন্য ১৯২৫ সালের ১৮ নভেম্বর তৎকালীন ব্রিটিশ গভর্নর হাউসে টংকনাথ চৌধুরীকে ব্রিটিশ সরকার চৌধুরী উপাধিতে ভূষিত করেন।
কথিত আছে, টংকনাথের আমন্ত্রণে তৎকালীন বড়লাট এবং দিনাজপুরের মহারাজা গিরিজনাথ রায় রাণীশংকৈলে এলে আমন্ত্রিত অতিথিদের টাকার নোট পুড়িয়ে রীতিমতো রাজকীয় অভ্যর্থনা ও আপ্যায়ন করান এবং পর্যাপ্ত স্বর্ণালংকার উপহার দেন। এর ফলে তৎকালীন ব্রিটিশ সরকারের কাছ থেকে চৌধুরী উপাধি এবং দিনাজপুরের মহারাজা গিরিজনাথ রায়ের কাছ থেকে রাজা উপাধি পান। পরবর্তীতে দিনাজপুরের মহারাজা গিরিজনাথ রায়ের বশ্যতা স্বীকার করে রাজা উপাধি পান।
পরবর্তীতে রাজা টংকনাথের স্ত্রী রাণী শংকরী দেবীর নামানুসারে মালদুয়ার স্টেটের নামকরণ করা হয় রাণীশংকৈল। দেশভাগের প্রাক্কালে রাজা জমিদারি ছেড়ে ভারতে পাড়ি জমান। এর মধ্য দিয়ে মালদুয়ার স্টেট রাজা টংকনাথ চৌধুরীর জমিদারি পরম্পরার সমাপ্তি ঘটে। রাজবাড়ি থেকে প্রায় দুশ মিটার দক্ষিণে কুলিক নদীর তীরে রাস্তার পূর্বপ্রান্তে রয়েছে জয়কালী মন্দির। এই মন্দিরটি রাজবাড়ির চেয়েও প্রাচীন। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পাকসেনারা মন্দিরটির ক্ষতি সাধন করে। বর্তমানে ওই এলাকার হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা ইসকন মন্দির সংস্কার করে পূজা অর্চনা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন।
প্রায় প্রতিদিনই অনেক আগ্রহভরে দৃষ্টিনন্দন এই রাজবাড়িটি দেখতে আসেন দূরদূরান্তের মানুষ। এছাড়াও প্রতি ঈদের ছুটিতে হাজার হাজার ভ্রমণপিপাসুরা আসেন রাজবাড়ীটির সৌন্দর্য উপভোগ করতে। রাজবাড়িটি ২০১৯ সালে গেজেট হয়। ইতিহাস ঐতিহ্যের কারণে ৯ জানুয়ারি হানিফ সংকেতের ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ইত্যাদি রাজবাড়িতে অনুষ্ঠিত হয়। রাজবাড়ীটি দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত ও জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে থাকায় রাণীশংকৈলের কৃতি সন্তান সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মেহেদী হাসান শুভ হাইকোর্টে রিট করে প্রত্নতাত্ত্বিক অধিদপ্তরের নজরে আসে। ২০২৪ সালে রাজবাড়ি পরিদর্শনে আসেন প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের মহাপরিচালক সাবিনা আলম।
এ সময় তিনি রাজবাড়িটিকে সংস্কারের আশ্বাস দেন। পরবর্তীতে ১০ লাখ টাকা ব্যায়ে সামান্যতম সংস্কার কাজ শুরু করলেও তা বন্ধ হয়ে যায়।রাজা টংকনাথের রাজবাড়ীটি সংস্কার করা হলে এটি হতে পারে ঠাকুরগাঁওয়ের একটি আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র এমন মন্তব্য দর্শনার্থীদের। যদিও কিছুদিন আগে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর থেকে বাড়িটির কিছু সংস্কার করা হয়েছে তবে এটি চলমান রাখার দাবি এলাকাবাসীর। অনেকে মনে করেন এখানে একটি পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তুলে বাড়িটি সংরক্ষণ করা প্রয়োজন।
দিনাজপুর থেকে আসা ভ্রমণ পিপাসু আব্দুর রশিদ, বাবলা হোসেন, মোনালিসা সহ অনেকে জানায়, এখনো রাজা টংকনাথের রাজবাড়ি যদি পরিপূর্ণ ভাবে সংস্কার করা যায় তবে এটি যেমন ভ্রমণ পিপাসুরা পাবে একটি মনোরম পরিবেশের জায়গা। ঠিক তেমনি সরকার পাবে প্রতি বছরে লাখ লাখ টাকা রাজস্ব। স্থানীয় বেরকার যুবকরা পাবে কর্মসংস্থান।
ক্রীড়া সংগঠক ও সাবেক অধ্যক্ষ তাজুল ইসলাম বলেন, রাজা টংকনাথের এই রাজবাড়ী শুধু রাণীশংকৈলের ঐতিহ্য বহন করে না এটি গোটা জেলার একটি ইতিহাস বহন করে।তাই আমাদের দাবী সরকারের উচিৎ হবে রাজবাড়ি টি সংস্কার করে অতি দ্রুত একটি পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে ঘোষণা করা। তবেই সরকার এই অঞ্চল থেকে লাখ লাখ টাকা যেমন রাজস্ব আদায় করতে পারবে, তেমনি এই এলাকার অনেকের বেকারত্ব দূর হবে তৈরি হবে কর্মসংস্থান ও নতুন নতুন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান।

