শাহজাহান আলী মনন, নীলফামারী জেলা প্রতিনিধি:
নীলফামারী-৪ (সৈয়দপুর-কিশোরগঞ্জ) আসনে নির্বাচনী উত্তাপ এখন তুঙ্গে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসনে ভোটের সমীকরণে বড় পরিবর্তন আসতে শুরু করেছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য ও মাঠের পরিস্থিতি বলছে, জনপ্রিয়তা ও প্রচার-প্রচারণায় খুবই সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত প্রার্থী হাফেজ মাওলানা আব্দুল মুনতাকিম।
এক সময় জাতীয় পার্টির দুর্গ হিসেবে পরিচিত এই আসনে ২০০১ সালে ফাটল ধরিয়েছিলেন বিএনপির প্রয়াত নেতা আমজাদ হোসেন সরকার। তবে এবারের নির্বাচনে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক মিত্র বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থীরা একে অপরের মুখোমুখি হওয়ায় ভোটের সমীকরণ বদলে গেছে।
বিএনপি এখানে মনোনয়ন দিয়েছে জেলা শাখার সভাপতি আলহাজ্ব গফুর সরকারকে। কিন্তু দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং সাবেক এমপি আমজাদ হোসেন সরকারের পুত্র রিয়াদ আরফান সরকার রানা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে দাঁড়ানোয় বেশ বেকায়দায় পড়েছে ধানের শীষের শিবির।
বিএনপির ঘরের কোন্দলকে কাজে লাগিয়ে জামায়াত অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে মাঠ গোছাচ্ছে। দলীয় প্রার্থী হাফেজ মাওলানা আব্দুল মুনতাকিম দীর্ঘ সময় ধরে ভোটারদের দ্বারে দ্বারে গিয়ে ব্যক্তিগত ইমেজ তৈরি করেছেন। বিশেষ করে চব্বিশের আন্দোলনে কারাবন্দী হিসেবে জুলাই যোদ্ধাসহ তরুণ ভোটারদের পছন্দের প্রার্থী হিসেবে তার অবস্থান সৃষ্টি হয়েছে।
সেই সাথে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের মধ্যে ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে অন্যতম ক্লিন ইমেজের প্রার্থী হাফেজ মাওলানা আব্দুল মুনতাকিম।
এছাড়া এই আসনের ভোটের হিসাব-নিকাশের বড় ফ্যাক্টর বিহারী ক্যাম্পগুলোসহ উর্দুভাষী ৪০-৪২ হাজার ভোট এবার একচেটিয়াভাবে কোন একক প্রার্থীর পক্ষে যাবেনা। এই ভোট ভাগ হয়ে যাবে। এক্ষেত্রেও জামায়াত বেশ অগ্রসর।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, জামায়াত এখানে তাদের নিজস্ব ভোট ব্যাংকের সঙ্গে সাধারণ ভোটারদের একটি বড় অংশকে টানতে সক্ষম হচ্ছে। মাঠের কর্মীদের সংহতি এবং বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রচারণার কারণে ‘দাঁড়িপাল্লা’ প্রতীক নিয়ে জামায়াত এবার বড় কোনো চমক দেখানোর অপেক্ষায়।
অন্যদিকে, হারানো আধিপত্য ফিরে পেতে জোর তৎপরতা চালাচ্ছে জাতীয় পার্টি। দলটির প্রার্থী করা হয়েছে শিল্পপতি সিদ্দিকুল আলমকে। তিনি ঝিমিয়ে পড়া নেতা-কর্মীদের মাঠে নামাতে সক্ষম হয়েছেন। তবে জুলাই বিপ্লব পরবর্তী রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ভোটারদের নানা প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হচ্ছে লাঙল প্রতীকের অনুসারীদের। বিশেষ করে ২০২৪ এ দ্বাদশ সংসদে এমপি হয়ে আওয়ামী লীগে যোগদানের কসরত এবং চব্বিশের আন্দোলনের সময় বিতর্কিত ভূমিকা রাখায় বেশ সমালোচিত।
তাছাড়া জাতীয় পার্টির সৈয়দপুর উপজেলা সভাপতি ঠিকাদার আলহাজ্ব জয়নাল আবেদীন ও জেলা যুব সংহতির সাবেক সভাপতি রওশন মাহানামাসহ কিশোরগঞ্জ উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়নের জাপা সমর্থিত চেয়ারম্যান সম্প্রতি বিএনপিতে যোগদান করায় এবং দুইজন স্বতন্ত্র প্রার্থী ধানের শীষ প্রতীককে সমর্থন করে প্রার্থীতা প্রত্যাহার করায় বেশ বেকায়দায় পড়েছেন লাঙ্গল মার্কার প্রার্থী। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে ভোটারদের আস্থা ফেরাতে পারলে লড়াইটি শেষ পর্যন্ত ত্রিমুখী হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দিচ্ছেন না স্থানীয়রা।
সৈয়দপুর ও কিশোরগঞ্জ উপজেলা নিয়ে গঠিত এই আসনে এখন ৭ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। উল্লেখযোগ্য প্রার্থীরা হলেন, বাংলাদেশ জামায়াত ইসলামী মনোনীত প্রার্থী ( হাফেজ মাওলানা আব্দুল মুনতাকিম- দাড়িপাল্লা) বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদ দল বিএনপি হতে (আলহাজ্ব গফুর সরকার -ধানের শীষ) জাতীয় পার্টি হতে (সিদ্দিকুল আলম-লাঙ্গল) ইসলামি আন্দোলন বাংলাদেশ হতে ( শহিদুল ইসলাম- হাতপাখা) স্বতন্ত্র প্রার্থী (রিয়াদ আফরান সরকার রানা- ফুটবল)।
আর স্বতন্ত্র প্রার্থী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্রদল নেতা মামুনুর রশীদ মামুন (মোটর সাইকেল) ও বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির রওশন মাহানামা (কাঁঠাল) শেষ মূহুর্তে এসে প্রার্থীতা প্রত্যাহার করে ধানের শীষ প্রার্থীকে সমর্থন দিয়েছে। বিএনপির বিদ্রোহী ও দলিয় কোন্দল এবং জাতীয় পার্টির জুলাই বিপ্লবের নানা প্রশ্নের সম্মুখীন – ফলে সুবিধাজনক অবস্থায় জামায়াত প্রার্থী। সব মিলিয়ে নীলফামারী-৪ আসনের ফলাফল শেষ পর্যন্ত কোন দিকে যায় সেটিই এখন দেখার বিষয় বলে মনে করছেন ভোটার ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

