ইরানে সরকারবিরোধী আন্দোলনে অংশগ্রহণের অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়া ৮০০ জন বিক্ষোভকারীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর স্থগিত করেছে দেশটির সরকার। এই তথ্য নিশ্চিত করেছে যুক্তরাষ্ট্র। শুক্রবার (১৬ জানুয়ারি) হোয়াইট হাউসে আয়োজিত এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্টের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লিভিট এ কথা জানান।
তিনি বলেন, বুধবার (১৫ জানুয়ারি) এই ৮০০ জনের ফাঁসি কার্যকর হওয়ার কথা থাকলেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় অঞ্চলের একাধিক মিত্র দেশের প্রবল কূটনৈতিক চাপের মুখে ইরান সরকার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে। বিশ্লেষকদের মতে, টানা প্রায় ২০ দিন ধরে চলা ব্যাপক গণবিক্ষোভের ফলে তেহরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থা যে নজিরবিহীন সংকটে পড়েছে, এই সিদ্ধান্ত তারই স্পষ্ট প্রতিফলন।
ইরানের ইতিহাসে ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর গত ৪৭ বছরে এত বড়, বিস্তৃত ও সহিংস গণআন্দোলন আগে কখনো দেখা যায়নি। দেশটির প্রায় সব শ্রেণির মানুষ—শ্রমিক, ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী ও সাধারণ নাগরিক—এই আন্দোলনে যুক্ত হয়েছেন।
বিক্ষোভের মূল কারণ হিসেবে উঠে এসেছে ইরানের ভয়াবহ অর্থনৈতিক বিপর্যয়। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, দুর্বল শাসনব্যবস্থা ও অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনার ফলে ইরানি মুদ্রা রিয়ালের মান ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে এক মার্কিন ডলারের বিপরীতে পাওয়া যাচ্ছে প্রায় ৯ লাখ ৯৪ হাজার ৫৫ ইরানি রিয়াল।
এই চরম অবমূল্যায়নের ফলে খাদ্য, ওষুধ, জ্বালানি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। অনেক এলাকায় মানুষের পক্ষে দু’বেলা খাবার জোগাড় করাও অসম্ভব হয়ে পড়েছে, যা শেষ পর্যন্ত গণবিক্ষোভে রূপ নেয়।
বিক্ষোভের সূত্রপাত হয় গত ২৮ ডিসেম্বর, যখন রাজধানী তেহরানের ব্যবসায়ীরা জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে ধর্মঘট ডাকেন। শুরুতে এটি সীমিত আকারে থাকলেও কয়েক দিনের মধ্যেই দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে ইরানের ৩১টি প্রদেশের প্রায় সব শহর ও গ্রামে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ইরান সরকার ইন্টারনেট ও মোবাইল নেটওয়ার্ক পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়। একই সঙ্গে পুলিশ, নিরাপত্তা বাহিনী এবং সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার তথ্যমতে, সংঘর্ষ ও দমন-পীড়নে এ পর্যন্ত ১২ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন এবং হাজার হাজার বিক্ষোভকারী গ্রেপ্তার হয়েছেন।
বিক্ষোভ শুরু হওয়ার পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক ও বর্তমান রাজনৈতিক নেতৃত্ব ইরান পরিস্থিতির ওপর কড়া নজর রাখছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একাধিকবার ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের হুমকি দেন। বিশ্লেষকদের মতে, ৮০০ বিক্ষোভকারীর ফাঁসি কার্যকরের সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করায় ইরানকে শেষ পর্যন্ত পিছু হটতে হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ফাঁসি স্থগিতের সিদ্ধান্ত ইরানের পক্ষ থেকে একটি কৌশলগত নমনীয়তার ইঙ্গিত, যা সরাসরি মার্কিন সামরিক হামলার আশঙ্কা আপাতত কিছুটা কমাতে পারে।
যদিও এই সিদ্ধান্তের ফলে ৮০০ মানুষের জীবন তাৎক্ষণিকভাবে রক্ষা পেয়েছে, তবুও ইরানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি এখনো অত্যন্ত অস্থিতিশীল। দেশজুড়ে চলমান বিক্ষোভে প্রশাসনিক কার্যক্রম কার্যত অচল হয়ে পড়েছে এবং সরকার জনরোষ সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই সিদ্ধান্তকে একটি বড় কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে দেখলেও মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, গ্রেপ্তার হওয়া হাজারো বিক্ষোভকারীর ভবিষ্যৎ এখনো অনিশ্চিত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরান সরকার যদি দ্রুত রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংস্কারের পথে না হাঁটে, তাহলে এই সংকট আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।

