ইরানে দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর অভিযানে প্রাণহানির সংখ্যা সরকারি হিসাবের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সূত্রের তথ্যে উঠে এসেছে, এই দমন-পীড়নে নিহতের সংখ্যা ১২ হাজার থেকে ২০ হাজার পর্যন্ত হতে পারে।
মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম সিবিএস নিউজ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানায়, ইরানজুড়ে বিক্ষোভ দমনে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযান এতটাই ব্যাপক ও সহিংস ছিল যে, নিহতের প্রকৃত সংখ্যা এখনো নির্ভরযোগ্যভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি। তবে প্রাপ্ত তথ্য ও ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে ধারণা করা হচ্ছে, মৃতের সংখ্যা ভয়াবহ মাত্রায় পৌঁছাতে পারে।
গত পাঁচ দিন ধরে দেশটিতে ইন্টারনেট ও ফোন সংযোগ প্রায় সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন ছিল। মঙ্গলবার কিছু ফোন লাইন পুনরায় চালু হলে অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলো এই ব্যাপক প্রাণহানির চিত্র তুলে ধরে। যদিও বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন আগে নিহতের সংখ্যা তুলনামূলক কম জানিয়েছিল, তবে তারা শুরু থেকেই সতর্ক করে আসছিল যে প্রকৃত সংখ্যা সরকারি দাবির তুলনায় অনেক বেশি হতে পারে।
এদিকে ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইভেট কুপার মঙ্গলবার পার্লামেন্টে দেওয়া বক্তব্যে জানান, যুক্তরাজ্যের প্রাথমিক ধারণা অনুযায়ী অন্তত ২ হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, এই সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে এবং পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
সিবিএস নিউজের প্রতিবেদনে তেহরানের উপকণ্ঠে একটি মর্গের একটি ভিডিও ফুটেজের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে, যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। সিবিএস নিউজ ভিডিওটি যাচাই করে সত্যতা নিশ্চিত করেছে। প্রায় ১৬ মিনিটের ওই ভিডিওতে অন্তত ৩৬৬ থেকে ৪০০টি মরদেহ স্তূপ করে রাখা অবস্থায় দেখা যায়। ফরেনসিক কর্মীদের মৃতদেহে গুলির ক্ষত, শটগানের আঘাত এবং অন্যান্য গুরুতর জখম নথিভুক্ত করতে দেখা গেছে। মর্গের ভেতরে ছড়িয়ে থাকা রক্তাক্ত কাপড় ও স্বজনদের আহাজারি নিহতের প্রকৃত সংখ্যা সরকারি হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ইরান সরকার এখন পর্যন্ত বিক্ষোভে নিহতদের কোনো নিয়মিত বা পূর্ণাঙ্গ সরকারি পরিসংখ্যান প্রকাশ করেনি। তবে রয়টার্স একজন অজ্ঞাতনামা ইরানি কর্মকর্তার উদ্ধৃতি দিয়ে জানিয়েছে, নিহতের সংখ্যা প্রায় ২ হাজার হতে পারে। ওই কর্মকর্তা সহিংসতার জন্য বিদেশি মদতপুষ্ট ‘সন্ত্রাসী’ ও ভাড়াটে উসকানিকারীদের দায়ী করেছেন।
এর বিপরীতে নরওয়েভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা ‘ইরান হিউম্যান রাইটস’-এর প্রধান মাহমুদ আমিরি-মোগাদ্দাম বলেছেন, দমন-পীড়নের যে তথ্য তারা পাচ্ছেন, তা কল্পনাকেও ছাড়িয়ে গেছে। তিনি অভিযোগ করেন, নিরাপত্তা বাহিনী তেহরানের বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে গিয়ে আহতদের নাম ও ঠিকানা সংগ্রহ করতে হাসপাতাল কর্মীদের হুমকি দিচ্ছে। তার ভাষায়, ইরানবাসীকে কার্যত একটি বিশাল ‘একাকী কারাগারে’ বন্দি করে নির্যাতন ও হত্যা করা হচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানে চলমান দমন-পীড়নের কড়া নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি বিক্ষোভকারীদের আশ্বস্ত করে বলেছেন, ‘সাহায্য আসছে’। মঙ্গলবার নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প ইরানি বিক্ষোভকারীদের আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর দখল নেওয়ার আহ্বান জানান।
হোয়াইট হাউস সূত্রে জানা গেছে, এই সংকট নিয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জাতীয় নিরাপত্তা দল সম্ভাব্য সামরিক ও গোপন কৌশল নিয়ে বৈঠক করেছে। পেন্টাগনের সূত্র জানায়, ট্রাম্পকে কেবল প্রথাগত বিমান হামলা নয়, বরং বিভিন্ন ধরনের সামরিক ও গোয়েন্দা অভিযানের বিকল্প সম্পর্কেও ব্রিফ করা হয়েছে। ট্রাম্প সতর্ক করে বলেছেন, বিক্ষোভকারীদের ওপর সহিংসতা বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত তিনি ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে কোনো আলোচনায় বসবেন না।
এদিকে নির্বাসিত ইরানি ক্রাউন প্রিন্স রেজা পাহলভি সিবিএস নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ইরানি জনগণ এখন আর কেবল মৌখিক সমর্থন নয়, বরং কার্যকর আন্তর্জাতিক পদক্ষেপ দেখতে চায়। তার মতে, যত দ্রুত আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপ হবে, তত কম প্রাণহানি ঘটবে এবং বর্তমান শাসনের পতন ত্বরান্বিত হবে।
পাহলভি জানান, তিনি ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন। মানবাধিকার কর্মীদের দাবি অনুযায়ী, ইরানের ৮০ শতাংশেরও বেশি মানুষ বর্তমান শাসনব্যবস্থার অবসান চায়। মধ্যপ্রাচ্যের এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতির ভবিষ্যৎ এখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ‘রেসপন্সিবিলিটি টু প্রটেক্ট’—অর্থাৎ বেসামরিক নাগরিকদের রক্ষার দায়বদ্ধতা পালনের ওপর নির্ভর করছে।

