সত্যজিৎ দাস, (মৌলভীবাজার প্রতিনিধি):
মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জসহ বিভিন্ন উপজেলায় পরিবেশগত ছাড়পত্র ও সরকারি অনুমোদন ছাড়াই ৪৫টির বেশি ইটভাটা পরিচালিত হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়,এসব ভাটার কোনোটিরই বৈধ পরিবেশগত ছাড়পত্র নেই। কৃষিজমির উপরিভাগের উর্বর মাটি কেটে ইট তৈরির কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে, যা প্রচলিত আইনের সরাসরি লঙ্ঘন।
কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন,জমির ওপরের চার থেকে ছয় ইঞ্চি মাটিতেই সবচেয়ে বেশি উর্বরতা থাকে। এই স্তর সরিয়ে ফেললে দীর্ঘ সময়ের জন্য জমির উৎপাদনক্ষমতা কমে যায়। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর আনুমানিক দুই থেকে আড়াই কোটি ঘনফুট ফসলি জমির উপরিভাগের মাটি ইটভাটায় ব্যবহৃত হচ্ছে। এতে একদিকে ফসল উৎপাদন হ্রাস পাচ্ছে,অন্যদিকে পরিবেশের ভারসাম্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
পরিবেশ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে,কমলগঞ্জ উপজেলাসহ জেলায় ৪৫টি ইটভাটা সক্রিয় রয়েছে। এর মধ্যে ২৩টির আগে পরিবেশগত ছাড়পত্র থাকলেও তা পরে বাতিল করা হয়েছে। তবে ছাড়পত্র বাতিল হলেও কার্যক্রম বন্ধ হয়নি। ভাটার মালিকরা ছয় মাস পরপর উচ্চ আদালতে রিট করে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন।
ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন,২০১৩ অনুযায়ী পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের স্বার্থে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ইটভাটা স্থাপন বাধ্যতামূলক। একই সঙ্গে কৃষিজমি,পাহাড় ও টিলা থেকে মাটি সংগ্রহ করে ইট তৈরির কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার নিষিদ্ধ। এছাড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, আবাসিক এলাকা,পাহাড় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের তিন কিলোমিটারের মধ্যে ইটভাটা স্থাপনেও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। বাস্তবে এসব বিধিনিষেধের কার্যকর প্রয়োগ দেখা যাচ্ছে না।
কুলাউড়া, কমলগঞ্জ, জুড়ী, বড়লেখা, রাজনগর, শ্রীমঙ্গল ও সদর উপজেলায় একই চিত্র দেখা গেছে। কোথাও কোথাও এক কিলোমিটারের মধ্যেই তিন থেকে চারটি ভাটা গড়ে উঠেছে। অধিকাংশ ভাটার পাশে তিন ফসলি জমি থেকে আনা মাটির স্তূপ দেখা যায়। একেকটি ভাটায় বছরে প্রায় ২০ থেকে ৩০ লাখ ইট পোড়ানো হয়।
জেলা প্রশাসনের নির্দেশনায় এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার তত্ত্বাবধানে ২৩ ফেব্রুয়ারি বিকেলে কুলাউড়া উপজেলায় ভ্রাম্যমাণ অভিযান চালানো হয়। বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন,২০১০-এর আওতায় কৃষিজমি থেকে অবৈধভাবে মাটি কাটার অভিযোগে একটি মামলায় ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয় এবং একটি এক্সক্যাভেটরের ব্যাটারি জব্দ করা হয়। উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মোহাম্মদ আনিসুল ইসলাম জানান, জনস্বার্থে এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে।
বাংলাদেশ পরিবেশ সাংবাদিক ফোরামের জেলা সাধারণ সম্পাদক নূরুল মোহাইমীন বলেন, অবৈধ ইটভাটা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া দুঃখজনক। কৃষিজমির উর্বর মাটি অপসারণের ফলে কৃষি ও পরিবেশ দুটোই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
এ বিষয়ে ভাটার মালিকরা জানিয়েছেন,আইনি জটিলতা এড়াতে তারা উচ্চ আদালতে রিট করে কার্যক্রম চালাচ্ছেন। তবে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. জালাল উদ্দীন কৃষিজমির উপরিভাগের মাটি ব্যবহারে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) তানভীর হোসেন জানান,পরিবেশ অধিদপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হবে। মৌলভীবাজার পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. মাঈদুল ইসলাম বলেন, অধিকাংশ ভাটাই আদালতের রিটের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে।
পরিবেশবাদী ও কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আইনের কঠোর প্রয়োগ ছাড়া এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব নয়। কৃষিজমি ও পরিবেশ রক্ষায় দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি স্থানীয়দের।

