বছর পাল্টালেও বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দামের অস্থিরতা কমেনি; বরং সাম্প্রতিক সময়ে দাম পূর্বাভাস ছাড়িয়ে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে আবার দ্রুত নেমেও এসেছে। এই ওঠানামার প্রভাব পড়ছে বিভিন্ন দেশের অর্থনীতিতে, বাংলাদেশের বাজারেও যার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর স্বর্ণ কেনা এবং যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য–রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত—এই তিনটি বড় কারণ বর্তমানে স্বর্ণবাজারকে অস্থির করে তুলেছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমের এক বিশ্লেষণেও এ বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম আউন্সপ্রতি ৫ হাজার ডলারের সীমা অতিক্রম করে স্বল্প সময়ের জন্য আরও ওপরে উঠে যায়। একই সময়ে রুপা ও প্লাটিনামের দামও বাড়ে। এর প্রভাবে দেশের বাজারে ২২ ক্যারেট স্বর্ণের দাম ভরিপ্রতি রেকর্ড পর্যায়ে ওঠে। তবে পরে দুই দফায় দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাণিজ্যসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত ও শুল্কনীতি বৈশ্বিক বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা বাড়িয়েছে। যেসব দেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক সম্পর্ক টানাপোড়েনে রয়েছে, তাদের ওপর বাড়তি শুল্ক আরোপের পদক্ষেপ বিনিয়োগকারীদের উদ্বিগ্ন করেছে। ফলে ঝুঁকিপূর্ণ খাত থেকে সরে নিরাপদ সম্পদ হিসেবে স্বর্ণে বিনিয়োগ বাড়ছে।
বিনিয়োগ কৌশলবিদদের ভাষ্য, বিশ্ব পরিস্থিতি অস্থিতিশীল হলে স্বর্ণ সাধারণত নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে বিবেচিত হয়। বাণিজ্য উত্তেজনা, রাজনৈতিক বিভাজন ও নীতিগত অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে স্বর্ণের চাহিদা বাড়ছে।
আরেকটি বড় কারণ হলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর রিজার্ভ ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন। অনেক দেশ ডলারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে স্বর্ণের মজুত বাড়াচ্ছে। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও বৈদেশিক সম্পদ জব্দ হওয়ার ঘটনার পর বেশ কিছু দেশ বিকল্প নিরাপদ সম্পদ হিসেবে স্বর্ণকে গুরুত্ব দিচ্ছে।
ভূরাজনৈতিক উত্তেজনাও বাজারে প্রভাব ফেলছে। ইউক্রেন যুদ্ধ, গাজা সংকট এবং মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি–সচেতন করে তুলেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিগত অবস্থান নিয়ে বৈশ্বিক আলোচনা, যা ডলারের শক্তি ও বাজারের মনোভাব—দুই ক্ষেত্রেই প্রভাব ফেলছে।
ডলার দুর্বল হলে সাধারণত স্বর্ণের দাম বাড়ার প্রবণতা দেখা যায়, কারণ তখন অন্যান্য মুদ্রার বিনিয়োগকারীদের কাছে স্বর্ণ তুলনামূলক সস্তা হয়। সাম্প্রতিক সময়ে ডলার সূচকের ওঠানামার সঙ্গেও স্বর্ণের দামের পরিবর্তনের মিল পাওয়া গেছে।
তবে বাজারে মাঝে মাঝে দরপতনও দেখা দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক নেতৃত্ব ও নীতিগত স্থিতিশীলতা নিয়ে ইতিবাচক সংকেত এলে স্বর্ণসহ মূল্যবান ধাতুর দামে সাময়িক চাপ তৈরি হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বৈশ্বিক যুদ্ধঝুঁকি, বাণিজ্যনীতি ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ঘিরে অনিশ্চয়তা থাকায় স্বর্ণের বাজারে অস্থিরতা এখনই কাটার সম্ভাবনা কম। নিরাপদ বিনিয়োগ মাধ্যম হিসেবে স্বর্ণের আকর্ষণ এখনও শক্ত অবস্থানেই রয়েছে।

