রাজধানী ঢাকায় সাম্প্রতিক সময়ে তীব্র গ্যাস সংকটে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন নগরবাসী। আবাসিক এলাকার অধিকাংশ বাসায় পাইপলাইনে পর্যাপ্ত গ্যাস না থাকায় স্বাভাবিক রান্না ব্যাহত হচ্ছে। অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে এলপি গ্যাস সিলিন্ডার, বৈদ্যুতিক চুলা কিংবা লাকড়ির ওপর নির্ভর করছে, যা মধ্যবিত্তের জন্য বাড়তি খরচ ও ঝামেলার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৮ জানুয়ারি) রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, টানা কয়েক দিন ধরেই গ্যাস সংকট চলমান। কাফরুলের ইব্রাহিমপুর এলাকার বাসিন্দা তামিমা হোসেন (৫০) জানান, সাধারণত ভোরে রান্না সেরে নিলেও গত তিন দিন ধরে সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত একেবারেই গ্যাস পাচ্ছেন না। ফলে সকালের নাস্তা হোটেল থেকেই কিনে খেতে হচ্ছে।
একই পরিস্থিতি মোহাম্মদপুর এলাকাতেও। জাপান গার্ডেন সিটির এক বাসিন্দা বলেন, সকালে বাসায় নাস্তা বলতে ছিল শুধু বিস্কুট। আশপাশের হোটেলগুলোতে খাবারের জন্য দীর্ঘ লাইন। তিনি জানান, যে স্কুলে তিনি শিক্ষকতা করেন সেখানে ডে-কেয়ারে শিশুদের জন্য রান্না হয়, কিন্তু গ্যাস না থাকায় গত দুই দিন ধরে তা বন্ধ রয়েছে।
গ্যাস সংকটের কারণে শিশু ও বয়স্ক সদস্যদের খাবার ব্যবস্থাপনায় সবচেয়ে বেশি সমস্যা হচ্ছে বলেও জানান তিনি। পাশাপাশি সংকটের সুযোগে ইনডাকশন চুলা ও রাইস কুকারের দাম বেড়ে যাওয়ার অভিযোগ করেন অনেকেই।
গ্যাস সংকটের কারণ জানতে চাইলে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির অপারেশন ডিভিশনের জেনারেল ম্যানেজার প্রকৌশলী কাজী মোহাম্মদ সাইদুল হাসান জানান, আমিনবাজার থেকে আসা একটি গ্যাস সঞ্চালন লাইনে বুড়িগঙ্গা নদীর নিচে লিকেজ ধরা পড়েছে। নিরাপত্তাজনিত কারণে মোহাম্মদপুরসহ কয়েকটি এলাকায় গ্যাসের চাপ কমিয়ে রাখা হয়েছে।
তিনি বলেন, গত তিন দিন ধরে কোস্ট গার্ড, ফায়ার সার্ভিস ও ডুবুরি দল যৌথভাবে মেরামত কাজ চালাচ্ছে। একটি লিক ক্ল্যাম্প বসানো হলেও পুরোপুরি সমাধান হয়নি। নতুন বিশেষ ক্ল্যাম্প তৈরি করে আবার কাজ শুরু করতে হবে। আপাতত লিকেজ কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আনা গেছে এবং ধাপে ধাপে গ্যাসের চাপ বাড়ানো হবে।
কাফরুল, মোহাম্মদপুর, শেওড়াপাড়া, মিরপুর, উত্তরা, রামপুরা, বাড্ডা, বাসাবো, মগবাজারের নয়াটোলা, পুরান ঢাকার সূত্রাপুর, রায়সাহেব বাজার ও লক্ষ্মীবাজারসহ রাজধানীর বহু এলাকায় গ্যাস সংকট চরম আকার ধারণ করেছে। কোথাও ভোর বা গভীর রাতে অল্প সময়ের জন্য গ্যাস মিললেও তা দিয়ে স্বাভাবিক রান্না সম্ভব হচ্ছে না।
পুরান ঢাকার সূত্রাপুর এলাকার এক বাসিন্দা জানান, গত এক মাস ধরে সকালে গ্যাস থাকে না, আর গত তিন দিন পুরোপুরি বন্ধ। তিনি বলেন, গ্যাস না থাকায় নাস্তা না করেই অফিসে যেতে হয়েছে, হোটেলেও খাবারের জন্য দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
তিতাস গ্যাসের কর্মকর্তা আরও জানান, মোহাম্মদপুর এলাকায় সবচেয়ে বেশি অভিযোগ পাওয়া গেছে। লিকেজ শনাক্ত করে মেরামত করা হয়েছে এবং আশা করা হচ্ছে দুই-এক দিনের মধ্যে পরিস্থিতির উন্নতি হবে।
অন্যান্য এলাকার সংকট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অবৈধ গ্যাস সংযোগের কারণে অনেক জায়গায় বৈধ গ্রাহকরাও প্রয়োজনীয় গ্যাস পাচ্ছেন না। সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হলেও পুনরায় অবৈধ সংযোগ দেওয়া হচ্ছে, যা পরিস্থিতিকে ‘চোর-পুলিশ খেলার’ মতো করে তুলেছে।
এদিকে পাইপলাইনে গ্যাস না থাকায় এলপি গ্যাসের চাহিদা বেড়েছে। তবে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন নির্ধারিত দামে এলপিজি সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না বলে অভিযোগ করছেন ভোক্তারা, যা সংকটকে আরও তীব্র করে তুলেছে।

