মার্চের শুরুটা ছিল অদ্ভুত অস্বস্তিকর। সোমবার সকালে খবর ছড়িয়ে পড়তেই যেন সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও উদ্বেগের ছায়া নেমে এল। মধ্যপ্রাচ্যে হঠাৎ করে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়েছে। ইরানের হামলায় সৌদি আরবের সবচেয়ে বড় তেল শোধনাগার বন্ধ হয়ে গেছে। একই দিনে কাতার বন্ধ করে দিয়েছে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস—এলএনজি—উৎপাদন ও সরবরাহ। তারও চেয়ে বড় খবর, বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ জ্বালানি পরিবহনের পথ হরমুজ প্রণালি এখন বন্ধ।
ঢাকার সচিবালয়ে তখন ব্যস্ত সময়। বিশ্ববাজারে জ্বালানির সরবরাহে ধাক্কা লাগতেই বাংলাদেশেও শুরু হয়েছে শঙ্কা। কারণ দেশের জ্বালানি ব্যবস্থার বড় অংশই আমদানিনির্ভর। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের হিসাব বলছে, দেশে প্রতিদিন গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। কিন্তু এত দিন সরবরাহ করা হচ্ছিল মাত্র ২৬৫ থেকে ২৭০ কোটি ঘনফুট। যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় বুধবার থেকে সরবরাহ আরও ২০ কোটি ঘনফুট কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। সার কারখানা ও বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস কম দেওয়া হচ্ছে। ফলে কিছুটা বিদ্যুৎ উৎপাদন কমবে, আর কোথাও কোথাও লোডশেডিংও হতে পারে।
বাংলাদেশের জ্বালানি বাস্তবতা কঠিন। দেশের জ্বালানি তেলের প্রায় শতভাগই আমদানি করতে হয়। অপরিশোধিত তেল আসে মূলত সৌদি আরব ও আরব আমিরাত থেকে। আর গ্যাসের চাহিদার প্রায় ৩৫ শতাংশ পূরণ হয় বিদেশ থেকে আনা এলএনজি দিয়ে—যার বেশির ভাগই আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। এই অনিশ্চয়তার মধ্যেই বুধবার জরুরি বৈঠক ডাকেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তাদের নিয়ে দীর্ঘ বৈঠকের পর সচিবালয়ে সংবাদ সম্মেলনে তিনি সাংবাদিকদের সামনে দাঁড়ান।
তিনি শান্ত কণ্ঠে বললেন,
“জ্বালানি সরবরাহ ধীর হয়ে গেছে। জ্বালানি না থাকলে বিদ্যুৎ আসবে কোথা থেকে? কিছু লোডশেডিং হতে পারে, কিছুটা গ্যাস সংকটও হতে পারে। তবে সবাই যদি সাশ্রয়ী হয়, মার্চ পর্যন্ত পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব।” তিনি আরও বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধের সময়ের চেয়েও বড় ধাক্কা হতে পারে। তাই সবাইকে সহযোগিতা করতে হবে।
তবে মানুষের ধর্মীয় অনুভূতির কথা মাথায় রেখে একটি আশ্বাসও দেন তিনি—
ইফতার থেকে তারাবিহ পর্যন্ত এবং সাহ্রির সময় লোডশেডিং রাখা হবে না।
এদিকে পেট্রোবাংলা হিসাব করে দেখছে, গ্যাস সরবরাহ কীভাবে টিকিয়ে রাখা যায়। মঙ্গলবার পর্যন্ত এলএনজি থেকে প্রতিদিন প্রায় ৯৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যাচ্ছিল। কিন্তু বুধবার সেটি কমিয়ে ৭৫ কোটি ঘনফুটে নামিয়ে আনা হয়েছে। পরিকল্পনা হচ্ছে—ঈদের ছুটি পর্যন্ত এই সরবরাহ ধরে রাখা।
এ বছর বাংলাদেশ মোট ১১৫টি এলএনজি কার্গো আমদানির পরিকল্পনা করেছিল। এর মধ্যে ৪০টি কাতার থেকে, ১৬টি ওমান থেকে আসার কথা। কিন্তু সমস্যা হলো, ওমানও গ্যাস নেয় কাতার থেকেই। ফলে যুদ্ধের কারণে পুরো সরবরাহ ব্যবস্থাই অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় কাতারের জাহাজগুলোও এখন থমকে আছে।
তবে কিছু জাহাজ ইতিমধ্যে ওই প্রণালি পার হয়ে গেছে। তাই ৫, ৯ ও ১১ মার্চ তিনটি কার্গো বাংলাদেশে পৌঁছানোর কথা। এরপর আরও পাঁচটি জাহাজ আসার কথা রয়েছে, যদিও কাতারের সঙ্গে যোগাযোগ করেও এখনো নিশ্চিত বার্তা পাওয়া যাচ্ছে না।
অন্যদিকে তেলের বাজারেও চাপ বাড়ছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) বলছে, অপরিশোধিত তেলের প্রায় ২০ শতাংশ আসে হরমুজ প্রণালি হয়ে। সেটি এখন পুরোপুরি বন্ধ। যদিও পরিশোধিত তেল আসে চীন, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া থেকে, কিন্তু সেখানকার জাহাজও দেরিতে পৌঁছাচ্ছে।
বিপিসির হিসাব অনুযায়ী দেশে এখন পেট্রলের মজুত আছে ১৬ দিনের, অকটেন ৩০ দিনের এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের ফার্নেস তেল ৭৬ দিনের। কিন্তু বড় সমস্যা ডিজেল নিয়ে—মজুত আছে মাত্র ১৪ দিনের। ডিজেলের চাহিদাও হঠাৎ বেড়ে গেছে। সাধারণ সময়ে দিনে ১২ থেকে ১৪ হাজার টন বিক্রি হলেও গত তিন দিন ধরে তা বেড়ে হয়েছে ২০ থেকে ২৫ হাজার টন।
বিশ্ববাজারেও দাম বাড়ছে দ্রুত। মাত্র দুই দিনের মধ্যে প্রতি ব্যারেল ডিজেলের দাম ৮৮ ডলার থেকে বেড়ে ১৩৭ ডলারে পৌঁছেছে। এই পরিস্থিতিতে সরকার জ্বালানি সাশ্রয়ের জন্য জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। অপ্রয়োজনীয় আলোকসজ্জা বন্ধ রাখতে বলা হয়েছে, ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার কমিয়ে গণপরিবহন ব্যবহারের অনুরোধ করা হয়েছে। পাশাপাশি জ্বালানি পাচার রোধে জেলা প্রশাসন, পুলিশ ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশকে সতর্ক করা হয়েছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ম তামিম মনে করেন, তেলের চেয়ে গ্যাস সংকটই বেশি বড় হয়ে উঠতে পারে। তাঁর মতে, এখন সরকারের সামনে দুটি পথ—জ্বালানি সাশ্রয় করা এবং প্রয়োজনে বেশি দামে বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি কেনা।
তিনি বলেন, “চীন, জাপান, পাকিস্তান ও ভারত ইতিমধ্যে গ্যাসের রেশনিং শুরু করেছে। যুদ্ধ যদি দুই সপ্তাহের মধ্যে শেষ না হয়, তাহলে বড় ধরনের জ্বালানি সংকট তৈরি হতে পারে।”
সচিবালয়ের আলো তখন ধীরে ধীরে নিভছে। বাইরে সন্ধ্যা নামছে। শহরের মানুষ হয়তো এখনো পুরোটা বুঝতে পারেনি, কিন্তু দূরের সেই যুদ্ধের ধাক্কা ইতিমধ্যে ঢাকার বাতাসেও এসে পৌঁছেছে।
আর সেই ধাক্কা সামলাতে এখন প্রয়োজন একটাই—সাশ্রয়, সতর্কতা আর অপেক্ষা।

