ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে নয় দফা প্রতিশ্রুতির তালিকা প্রকাশ করেছিল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। তালিকার একেবারে শুরুতেই ছিল একটি বিশেষ অঙ্গীকার—‘ফ্যামিলি কার্ড’। তখন দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান ঘোষণা দিয়েছিলেন, ক্ষমতায় এলে প্রান্তিক ও নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোকে সুরক্ষা দিতে প্রতি মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা অথবা সমমূল্যের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ করা হবে।
নির্বাচনের পর ১৭ ফেব্রুয়ারি শপথ নেয় নতুন সরকার। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন তারেক রহমান। এরপর ১৯ ফেব্রুয়ারি আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকে অর্থমন্ত্রীকে প্রধান করে ফ্যামিলি কার্ড বাস্তবায়নে একটি মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন করা হয়। লক্ষ্য ছিল—ঈদের আগেই যেন কার্যক্রম শুরু করা যায়। সেই প্রাথমিক প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই সরকার ঘোষণা দেয়, ১০ মার্চ থেকে পরীক্ষামূলকভাবে ফ্যামিলি কার্ড চালু হবে।
প্রথম দফায় ১৪টি উপজেলার প্রতিটি থেকে একটি ইউনিয়নের একটি করে ওয়ার্ড বেছে নেওয়া হয়েছে। সেখানে প্রতিটি পরিবারের একজন নারী—মা বা নারী প্রধান—এই কার্ড পাবেন। সমাজকল্যাণমন্ত্রী এ জেড এম জাহিদ হোসেন সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে হওয়া বৈঠকের পর জানান, এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, একটি ওয়ার্ডে যতজন হতদরিদ্র, দরিদ্র বা নিম্নবিত্ত পরিবার উপযুক্ত হিসেবে চিহ্নিত হবেন, তাদের সবাইকে কার্ড দেওয়া হবে। কোনো ঘরে বসে তালিকা তৈরি নয়—ডোর-টু-ডোর পদ্ধতিতে সরাসরি তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। উপজেলা পর্যায়ে ইউএনও’র নেতৃত্বে এবং ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে সরকারি কর্মচারীদের সমন্বয়ে গঠিত কমিটি কাজটি পরিচালনা করছে। তদারকির জন্য প্রতিটি ওয়ার্ডে একজন প্রথম শ্রেণির গেজেটেড কর্মকর্তা থাকবেন। পাশাপাশি ভুলত্রুটি এড়াতে থাকবে দ্বিস্তর বিশিষ্ট চেকিং ও রি-চেকিং ব্যবস্থা।
কার্ডধারীরা প্রতি মাসে আড়াই হাজার টাকা করে পাবেন। এই অর্থ সরাসরি ব্যাংক হিসাব বা মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে পাঠানো হবে। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, একটি কার্ডে সর্বোচ্চ পাঁচজন সদস্য বিবেচনায় নেওয়া হবে। একান্নবর্তী পরিবারে সদস্য সংখ্যা বেশি হলে প্রতি পাঁচজনের জন্য আলাদা কার্ড দেওয়া হবে। তবে একই ব্যক্তি একাধিক ভাতা একসঙ্গে পাবেন না—এমন বিধান রাখা হয়েছে। পরিবারের অন্য সদস্যরা তাদের প্রাপ্য সুবিধা আলাদাভাবে পেতে পারবেন।
প্রাথমিক পর্যায়ে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে থেকে বরাদ্দ দেওয়া হবে। আগামী জুনে জাতীয় বাজেটে এই খাতে নিয়মিত বরাদ্দ রাখা হবে বলে জানিয়েছে সরকার। অর্থাৎ পাইলট প্রকল্প শেষ হওয়ার আগেই স্থায়ী অর্থায়নের ভিত্তি তৈরি করা হবে।
এখন পাইলট প্রকল্পের আওতায় নির্ধারিত ওয়ার্ডগুলোতে ঘরে ঘরে গিয়ে তথ্য সংগ্রহ চলছে। আগ্রহীদের জাতীয় পরিচয়পত্র, রঙিন ছবি এবং সচল মোবাইল নম্বর বা ব্যাংক হিসাবের তথ্য প্রস্তুত রাখতে বলা হয়েছে। পরবর্তীতে একটি নির্দিষ্ট আবেদন ফরম থাকবে, যা স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান বা সরকারের একটি অনলাইন পোর্টাল থেকে সংগ্রহ করা যাবে। স্বচ্ছতা নিশ্চিতে জাতীয় পরিচয়পত্রভিত্তিক একটি কেন্দ্রীয় ডাটাবেস তৈরি করা হচ্ছে।
এর আগে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে টিসিবির মাধ্যমে ‘স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ড’ চালু ছিল। সেই অভিজ্ঞতা মাথায় রেখেই এবার নগদ সহায়তা ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলোর সমন্বিত কাঠামো তৈরি করতে চায় নতুন সরকার।
সরকারের লক্ষ্য, চার মাসের মধ্যে পাইলট প্রকল্প শেষ করে পর্যায়ক্রমে দেশের প্রতিটি উপজেলায় এই কর্মসূচি সম্প্রসারণ করা। নির্বাচনের আগে ৪ কোটি পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, সেটিকে বাস্তবে রূপ দিতে এখন শুরু হলো পরীক্ষামূলক যাত্রা।
একটি ওয়ার্ড থেকে শুরু—সেখান থেকেই হয়তো নতুন সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার বড় এক অধ্যায়ের সূচনা।

