বিশেষ প্রতিনিধি , শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার) :
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংরক্ষণে নতুন প্রজন্মের সক্রিয় অংশগ্রহণ জাতির জন্য আশাব্যঞ্জক বার্তা বহন করে। সেই আশারই এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলের কৃতী শিক্ষার্থী সৈয়দা হাজেরা সুলতানা (শানজিদা)। আজ থেকে তিন বছর আগে, ২০২২ সালে, তার লেখা “মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষদর্শীর ভাষ্য” বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের সংগ্রহশালায় তালিকাভুক্ত ও সংরক্ষিত হয়।
সৈয়দা হাজেরা সুলতানা তখন শ্রীমঙ্গল সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ১০ম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিলেন। বর্তমানে তিনি সিলেটের ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মুরারিচাঁদ কলেজে পদার্থবিজ্ঞান সম্মান (১ম বর্ষে) অধ্যয়নরত। কিশোর বয়সেই মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংরক্ষণে তার এই অবদান প্রশংসিত হয়েছে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে।
মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর কর্তৃক প্রেরিত আনুষ্ঠানিক স্বীকারপত্র অনুযায়ী, সৈয়দা হাজেরা সুলতানার সংগৃহীত প্রত্যক্ষদর্শীর ভাষ্যটি ১৯ অক্টোবর ২০২২ তারিখে জাদুঘরে পৌঁছায় এবং স্থায়ীভাবে সংগ্রহশালায় সংরক্ষিত হয়। তার লেখার ক্রমিক নম্বর ৫২০১৩। এই ভাষ্যটি তিনি তার বাবা কমরেড সৈয়দ আমিরুজ্জামানের কাছ থেকে শোনা মুক্তিযুদ্ধকালীন অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে লিপিবদ্ধ করেন। হাজেরার পিতা দেশের একজন প্রথিতযশা গুণী ব্যক্তি, যিনি বাংলাদেশ ছাত্র মৈত্রীর সাবেক কেন্দ্রীয় নেতা, ‘৯০-এর মহান গণ-অভ্যুত্থানের সংগঠক, বহুমাত্রিক লেখক ও সাহিত্যিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও তাত্ত্বিক, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির মৌলভীবাজার জেলা সম্পাদক মণ্ডলীর সদস্য, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক, দ্য ফিনান্সিয়াল পোস্ট ও সাপ্তাহিক নতুন কথা’র বিশেষ প্রতিনিধি, আরপি নিউজের সম্পাদক ও বিশিষ্ট কলামিস্ট। একজন প্রত্যক্ষদর্শীর স্মৃতিচারণকে লিখিত রূপ দিয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণ করাই ছিল তার মূল লক্ষ্য।
স্বীকারপত্রে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি ও প্রকল্প পরিচালক মফিদুল হক উল্লেখ করেন, সৈয়দা হাজেরা সুলতানার লেখা সুন্দর ও তথ্যবহুল হয়েছে এবং এর মাধ্যমে তিনি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস আহরণ ও সংরক্ষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজের অংশীদার হয়েছেন। স্থানীয় মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংগ্রহে তার ভূমিকা জাদুঘর কর্তৃপক্ষকেও অনুপ্রাণিত করেছে বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়।
মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের সংগ্রহশালায় জমাকৃত প্রত্যক্ষদর্শীর ভাষ্য-সংগ্রাহকদের ৩৩তম তালিকা মে ২০২২-এ প্রকাশিত হয়, যেখানে ক্রমিক নম্বর ৪৯৫০৩ পর্যন্ত নাম অন্তর্ভুক্ত ছিল। জাদুঘর কর্তৃপক্ষ আশাবাদ ব্যক্ত করেছে যে, পরবর্তী তালিকায় সৈয়দা হাজেরা সুলতানার নামও আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত হবে।
উল্লেখ্য, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ঢাকার আগারগাঁওয়ে অবস্থিত একটি নাগরিক উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত জাতীয় প্রতিষ্ঠান, যা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, মানবাধিকার, শান্তি ও সম্প্রীতির চেতনা নতুন প্রজন্মের মাঝে ছড়িয়ে দিতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। শিক্ষার্থীদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে উদ্বুদ্ধ করতে পরিচালিত বিশেষ প্রকল্পের আওতায় হাজেরার মতো তরুণদের লেখা সংগ্রহ করা হচ্ছে।
একজন শিক্ষার্থীর এই সাফল্য শুধু ব্যক্তিগত গৌরব নয়, বরং এটি প্রমাণ করে—পরিবারের ভেতর সংরক্ষিত স্মৃতি, গল্প ও অভিজ্ঞতাগুলো লিপিবদ্ধ হলে সেগুলোই হয়ে উঠতে পারে জাতির অমূল্য ইতিহাস। সৈয়দা হাজেরা সুলতানার এই উদ্যোগ নতুন প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধ জানার পাশাপাশি ইতিহাস সংরক্ষণের দায়িত্ব নিতে উদ্বুদ্ধ করবে—এমনটাই প্রত্যাশা সংশ্লিষ্ট মহলের।

