মোঃ তৌহিদুর রহমান, রাজবাড়ী প্রতিনিধি:
শরীরের দুই পাশে বাঁধা দুটি পাঁচ লিটারের খালি পানির প্লাস্টিকের বোতল। সেই পানির বোতল বুকের নিচে দিয়ে পানিতে ভেসে থাকার চেষ্টা করছে অনেক শিশু। কেউ আবার পুকুরের কিনারে লাঠি ধরে পানিতে ভেসে থাকার চেষ্টা করছে। পুকুরপাড়ে দাঁড়িয়ে উদ্বিগ্ন চোখে দেখছেন অভিভাবকেরা। ভয় কাটিয়ে ধীরে ধীরে পানির সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তুলছে শিশু-কিশোররা। পানিতে নেমে তাদের সাহষ দিচ্ছে কয়েক জন স্বেচ্ছাসেবক।
রাজবাড়ী শহরের পাশের রামকান্তপুর গ্রামে স্থানীয় রাবেয়া-কাদের স্মৃতি পাঠাগারের উদ্যোগে এমনই ব্যতিক্রমী সাঁতার প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চলছে। রাবেয়া-কাদের ফাউন্ডেশনের নিজস্ব পুকুরে আয়োজিত এই প্রশিক্ষণ শুরু হয়েছে গত ২৩ ফেব্রুয়ারি থেকে, যা চলবে আগামী ৩ মার্চ পর্যন্ত। এলাকার কয়েকজন স্বেচ্ছাসেবী ব্যক্তি স্বতঃস্ফূর্তভাবে এতে সহযোগিতা করছেন। শুক্রবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) সকালে প্রশিক্ষণস্থলে গিয়ে দেখা যায়, প্রায় ৪০ জন শিশু-কিশোর খালি পানির বোতল ব্যবহার করে পানিতে নেমে সাঁতার শেখার অনুশীলন করছে। প্রশিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন বাসন্তী মন্ডল, কালাম মাস্টার, নিবির, সোহান ও রবি। পুরো কার্যক্রম তদারকি করছেন আয়োজকদের একজন আসাদুজ্জামান চৌধুরী বাবলা।
মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই অনেক শিশু পানিভীতি কাটিয়ে সাঁতার শিখে ফেলেছে। অংশগ্রহণকারী শ্রেয়া গুহ জানায়, আগে সে পানিতে নামতেই ভয় পেত। কিন্তু পাঁচ দিনের প্রশিক্ষণেই সে সাঁতার শিখে নিয়েছে। এখন পানিতে নামতে তার আর ভয় লাগে না, বরং সাঁতার কাটতে তার ভীষণ আনন্দ লাগে
পাঠাগারের কর্মী ও প্রশিক্ষক রবি বলেন, বর্তমানে গ্রামাঞ্চলেও আগের মতো পুকুর নেই। ফলে নতুন প্রজন্ম সাঁতার শেখার সুযোগ পাচ্ছে না। অথচ জীবন রক্ষার জন্য সাঁতার জানা অত্যন্ত জরুরি। এ ধরনের উদ্যোগ সব এলাকায় নেওয়া প্রয়োজন। আয়োজকদের অন্যতম সোহানুর রহমান জানান, প্রশিক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় আধুনিক সরঞ্জাম তাদের নেই। তবে মনোবল ও সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকেই তারা সনাতন পদ্ধতিতে শিশুদের সাঁতার শেখাচ্ছেন। ভবিষ্যতেও এ উদ্যোগ চালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।
রাজবাড়ী থিয়েটারের সভাপতি ও আয়োজক আসাদুজ্জামান চৌধুরী বাবলা বলেন, পাঠাগারে সাংস্কৃতিক কার্যক্রম পরিচালনার সময় তারা জানতে পারেন, এলাকার অনেক শিশু সাঁতার জানে না। সাঁতার না জানার কারণে অতীতে রাজবাড়ীর কয়েকজন মেধাবী শিক্ষার্থীর অকাল মৃত্যু হয়েছে। সেই বেদনাবোধ থেকেই শিশুদের জীবন রক্ষার দক্ষতা শেখাতে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। রাবেয়া-কাদের স্মৃতি পাঠাগারের প্রতিষ্ঠাতা মো. নজরুল ইসলাম বলেন, নতুন প্রজন্মের অনেকেই এখন সাঁতার শেখার সুযোগ থেকে বঞ্চিত। দেশে পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। সাম্প্রতিক সময়েও রাজবাড়ীতে পানিতে পড়ে কয়েকজনের মৃত্যু হয়েছে। শুরুতে ৩০ জন শিশু নিয়ে প্রশিক্ষণ শুরু হলেও পরে আগ্রহ বাড়ায় অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। ভবিষ্যতেও এ কার্যক্রম নিয়মিত চালু রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।
স্থানীয়দের মতে, প্রযুক্তিনির্ভর জীবনে শিশুদের শারীরিক চর্চা কমে যাওয়ার এই সময়ে এমন উদ্যোগ শুধু বিনোদন নয়, বরং জীবন বাঁচানোর শিক্ষা দিচ্ছে। সাঁতার শেখার মাধ্যমে শিশুরা যেমন আত্মবিশ্বাস অর্জন করছে, তেমনি তৈরি হচ্ছে পানিতে দুর্ঘটনা প্রতিরোধের সচেতনতা।

