ওয়াকফ (সংশোধনী) বিল, ২০২৫ নিয়ে ভারতের সংসদে উত্তপ্ত বিতর্ক চলছে। বিলটি কেন্দ্রীয় সংখ্যালঘু বিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজিজু লোকসভায় পেশ করেন এবং তিনি একে দেশের স্বার্থে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। তবে বিরোধী দলগুলো একে অসাংবিধানিক এবং মুসলিম সম্প্রদায়ের ধর্মীয় অধিকার খর্বকারী হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
বিলের মূল পরিবর্তনসমূহ:
ওয়াকফ (সংশোধনী) বিল, ২০২৫ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনেছে, যা বর্তমানে প্রচলিত ১৯৯৫ সালের ওয়াকফ আইনের কাঠামোকে বদলে দেবে। প্রধান পরিবর্তনগুলোর মধ্যে রয়েছে—
১. ওয়াকফ বোর্ডের একচ্ছত্র ক্ষমতা হ্রাস
বর্তমান আইনের অধীনে, ওয়াকফ বোর্ডের হাতে যে কোনো সম্পত্তিকে “ওয়াকফ সম্পত্তি” ঘোষণা করার ক্ষমতা রয়েছে, এবং এই সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করার সুযোগ সীমিত। নতুন সংশোধনীতে প্রস্তাব করা হয়েছে, এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার চূড়ান্ত ক্ষমতা ওয়াকফ বোর্ডের পরিবর্তে জেলা প্রশাসনের (ডিসি বা সমপর্যায়ের কর্মকর্তা) হাতে থাকবে। সরকারের মতে, এটি নিশ্চিত করবে যে ওয়াকফ বোর্ড অন্য ধর্মের ব্যক্তিদের বা দরিদ্র মুসলিমদের জমি অন্যায়ভাবে অধিগ্রহণ করতে না পারে।
২. ওয়াকফ বোর্ডে অমুসলিম সদস্যের অন্তর্ভুক্তি
বর্তমান আইনে শুধুমাত্র মুসলিম সদস্যদের নিয়েই ওয়াকফ বোর্ড গঠিত হয়। নতুন সংশোধনী অনুযায়ী, ওয়াকফ বোর্ডে অন্তত দুজন অমুসলিম সদস্য রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। সরকারের দাবি, এটি বোর্ডের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা এবং ধর্মনিরপেক্ষতা বজায় রাখতে সহায়ক হবে। তবে বিরোধীরা একে মুসলিম সম্প্রদায়ের স্বায়ত্তশাসনের ওপর হস্তক্ষেপ বলে মনে করছে।
৩. কেন্দ্রীয় পোর্টাল চালু করা
ওয়াকফ সম্পত্তির রেকর্ড সংরক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি কেন্দ্রীয় পোর্টাল চালু করার প্রস্তাব রয়েছে। সরকারের মতে, এটি ওয়াকফ সম্পত্তি সংক্রান্ত জালিয়াতি এবং বেআইনি দখলদারি রোধে সাহায্য করবে।
বিরোধীদের আপত্তি
বিরোধী দলগুলো, বিশেষত কংগ্রেস, তৃণমূল, সিপিএম, ডিএমকে এবং সমাজবাদী পার্টি, এই বিলের বিরুদ্ধে জোরালো আপত্তি জানিয়েছে। কংগ্রেস সাংসদ গৌরব গগৈ সংসদে বলেন, “এই বিল সংবিধানকে অবজ্ঞা করতে চায়, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে অপদস্থ করতে চায় এবং ভারতের সমাজকে বিভক্ত করতে চায়।”
তৃণমূল সাংসদ সৌগত রায় বিলটি পেশ করার পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং অভিযোগ করেন যে সরকার তাড়াহুড়ো করে এটি পাশ করাতে চাইছে।
বিরোধীদের মূল আপত্তি তিনটি—
- ধর্মীয় স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ: বিরোধীদের মতে, এই বিল মুসলিমদের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান পরিচালনার অধিকারে হস্তক্ষেপ করছে, যা সংবিধানের মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী।
- ওয়াকফ বোর্ডের ক্ষমতা খর্ব: বিরোধীদের অভিযোগ, সরকার ওয়াকফ বোর্ডের ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে মুসলিম সম্প্রদায়ের ধর্মীয় ও সামাজিক কাঠামোকে দুর্বল করতে চাইছে।
- সরকারি নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি: বিরোধীরা বলছে, নতুন বিলে সরকার ওয়াকফ সম্পত্তির ওপর অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে চাইছে, যা সংখ্যালঘুদের স্বার্থের পরিপন্থী হতে পারে।
সরকারের পাল্টা যুক্তি
কেন্দ্রীয় মন্ত্রী কিরেন রিজিজু এবং বিজেপির অন্যান্য নেতারা বিরোধীদের অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে দাবি করেছেন, এই বিল মুসলিম সম্প্রদায়ের ধর্মীয় বিশ্বাসে হস্তক্ষেপ করছে না বরং ওয়াকফ সম্পত্তির স্বচ্ছতা ও ন্যায়সঙ্গত ব্যবস্থাপনার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছে।
রিজিজু বলেন, “এই বিল শুধুমাত্র ওয়াকফ সম্পত্তির দেখভালের কাঠামোকে সুশৃঙ্খল করতে চায়। বিরোধীরা ভুল তথ্য এবং গুজব ছড়াচ্ছে।”
তিনি আরও দাবি করেন যে ইউপিএ সরকার সংসদ এবং বিমানবন্দরের জমি ওয়াকফের হাতে তুলে দিতে চেয়েছিল, যা বর্তমান সরকার রুখে দিয়েছে। তাঁর কথায়, “প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ওয়াকফের হাতে সংসদ ভবনের অধিগ্রহণ আটকেছেন।”
বিল নিয়ে সংসদীয় হিসাবনিকাশ
লোকসভায় বিলটি পাশ করানোর জন্য ২৭২ জন সাংসদের সমর্থন প্রয়োজন। বিজেপির ২৪০ জন সাংসদ রয়েছে, জেডিইউ-এর ১২, টিডিপির ১৬, শিন্দেসেনার ৭ এবং চিরাগ পাসওয়ানের এলজেপি (রামবিলাস)-এর ৫ জন সাংসদ রয়েছে। ফলে বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ সহজেই বিলটি পাশ করাতে পারবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে রাজ্যসভায় পরিস্থিতি কিছুটা জটিল হতে পারে। সেখানে ১২৫ জন সাংসদের সমর্থন দরকার, যেখানে এনডিএ জোটের ১২৫ জন সাংসদ রয়েছে। যদিও কয়েকটি আসন ফাঁকা থাকায়, তাদের ১১৮ জন সাংসদের ভোট পেলেই বিলটি পাশ হবে।
বিলের পক্ষে ও বিপক্ষে অবস্থানকারী দলগুলো
✅ বিলের পক্ষে
- বিজেপি (২৪০ সাংসদ)
- জেডিইউ (১২ সাংসদ)
- টিডিপি (১৬ সাংসদ)
- শিন্ডে শিবসেনা (৭ সাংসদ)
- এলজেপি (রামবিলাস) (৫ সাংসদ)
❌ বিলের বিপক্ষে
- কংগ্রেস
- তৃণমূল কংগ্রেস
- সিপিএম ও সিপিআই
- ডিএমকে
- সমাজবাদী পার্টি
- আম আদমি পার্টি (AAP)
সারসংক্ষেপ
ওয়াকফ (সংশোধনী) বিল, ২০২৫ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। বিজেপি এবং তাদের মিত্র দলগুলোর মতে, এই বিল সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষা করবে এবং ওয়াকফ সম্পত্তির অব্যবস্থাপনা দূর করবে। তবে বিরোধীরা এটিকে মুসলিমদের ধর্মীয় স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ বলে মনে করছে এবং দাবি করছে যে এটি মুসলিমদের বিরুদ্ধে বৈষম্যমূলক একটি পদক্ষেপ।
এখন দেখার বিষয়, রাজ্যসভায় ভোটাভুটি কীভাবে হয় এবং বিরোধীরা সংসদের বাইরে এই ইস্যুটি নিয়ে কতটা আন্দোলন গড়ে তুলতে পারে। আপনার দৃষ্টিতে, এই বিল কি সত্যিই মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য উপকারী, নাকি এটি ধর্মীয় স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ?