প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন শুল্ক ঘোষণা করার পর, বিশ্বব্যাপী শেয়ার বাজারে ব্যাপক পতন হয়েছে, যা অর্থনীতির জন্য গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। বিশেষত, এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক, যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৫০০টি বৃহত্তম কোম্পানির শেয়ার মূল্য ট্র্যাক করে, ৪.৮% কমে গিয়ে ২০২০ সালের কোভিড-১৯ মহামারীর পর সবচেয়ে বড় এক দিনের পতন রেকর্ড করেছে। একই সময়ে, বৃহত্তম কনজিউমার ব্র্যান্ডগুলো যেমন নাইক, অ্যাপল এবং টার্গেট, সবকটি ৯% এর বেশি পতন দেখেছে।
ট্রাম্পের শুল্ক ঘোষণা একটি ব্যাপক অর্থনৈতিক পরিকল্পনার অংশ হিসেবে আসছে, যেখানে তিনি ১০% এর কমপক্ষে শুল্ক আরোপ করতে যাচ্ছেন বিভিন্ন দেশের আমদানি পণ্যের ওপর। তার দাবি, এই শুল্ক ব্যবস্থা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি শক্তিশালী করবে এবং দেশের উৎপাদন খাতকে ফিরিয়ে আনবে। ট্রাম্প সংবাদমাধ্যমকে জানান, “আমরা শুল্ক আরোপ করব, কিন্তু এর ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি বুম করবে, আমাদের রাজস্ব বাড়বে, এবং আমাদের উৎপাদন দেশে ফিরে আসবে।”
তবে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যবিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন যে, ট্রাম্পের এই শুল্ক পরিকল্পনা শুধু যুক্তরাষ্ট্রের জন্যই বিপজ্জনক নয়, বরং সারা পৃথিবীর অর্থনীতির জন্যও মারাত্মক পরিণতি বয়ে আনতে পারে। বিশেষত, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (WTO) তাদের প্রতিবেদনে বলেছে যে, এই শুল্কের ফলে ২০২৪ সালে বৈশ্বিক বাণিজ্য ১% হ্রাস পেতে পারে, যা অনেক দেশের জন্য ক্ষতিকর হবে। ব্যবসায়ীরা উদ্বেগ প্রকাশ করছেন যে, শুল্ক আরোপের ফলে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি পাবে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি থমকে যাবে, যা দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য বিপদজ্জনক হতে পারে।
বিশ্বের প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার দেশগুলোর প্রতিক্রিয়া
নতুন শুল্ক ঘোষণার পর, ট্রাম্পের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার চীন ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন তাদের প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। চীন, যা ৫৪% শুল্কের মুখোমুখি হবে, তারা এ সম্পর্কে শক্ত প্রতিশোধ গ্রহণের হুমকি দিয়েছে। চীনা কর্মকর্তারা বলেছেন, তারা এই শুল্ক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলবে এবং এর ফলস্বরূপ বিশ্বের বাণিজ্য ব্যবস্থায় অস্থিরতা সৃষ্টি হতে পারে। ইউরোপীয় ইউনিয়নও ২০% শুল্কের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে এবং ট্রাম্পের একতরফা সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তাদের ক্ষোভ প্রকাশ করেছে।
এছাড়া, বিশ্বের অন্যান্য দেশগুলোও ট্রাম্পের শুল্ক ঘোষণাকে অত্যন্ত বিতর্কিত হিসেবে মনে করছে। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলো, যারা মার্কিন বাজারে তাদের পণ্য রপ্তানি করে, তারা এই সিদ্ধান্তকে তাদের অর্থনীতির জন্য বিরাট হুমকি হিসেবে দেখছে।
নতুন শুল্কের সম্ভাব্য প্রভাব
ট্রাম্পের শুল্ক ব্যবস্থা, যদি পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়, তা শুধু দেশের ভোক্তাদের উপরই প্রভাব ফেলবে না, বরং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং সরবরাহ চেইনকেও বিপর্যস্ত করবে। যেসব পণ্য, যেমন প্রযুক্তি, পোশাক, গাড়ি এবং খাদ্য, পৃথিবীজুড়ে বড় বাজারে প্রভাবিত হবে, সেগুলোর দাম বেড়ে যাবে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তারা আরও বেশি দামে পণ্য কিনতে বাধ্য হবে, যা মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়াবে।
এছাড়া, শুল্কের কারণে আমেরিকান কোম্পানিগুলোর জন্য উত্পাদন খরচ বেড়ে যাওয়া সম্ভব, যার ফলে তাদের লাভের মার্জিন সংকুচিত হবে। এটি কিছু ক্ষেত্রে কোম্পানিগুলোর চাকরি সংকোচন এবং উৎপাদন স্থান পরিবর্তনের দিকে নিয়ে যেতে পারে। তাছাড়া, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়তে থাকলে, বেশ কিছু মার্কিন কোম্পানির আন্তর্জাতিক বাজারে সাফল্য সীমিত হয়ে যেতে পারে।
বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক প্রতিক্রিয়া
এদিকে, যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপীয় এবং এশিয়ান বাজারগুলোও শুল্ক ঘোষণার প্রভাবে ব্যাপক পতন দেখেছে। এফটিএসই ১০০ সূচক, যা যুক্তরাজ্যের শেয়ার বাজারের মূল সূচক, ১.৫% কমেছে, এবং অন্যান্য ইউরোপীয় বাজারগুলোও পতিত হয়েছে। এশিয়ার বাজারগুলোও পিছিয়ে পড়েছে, যার ফলে বিশ্বের বড় অর্থনৈতিক দেশগুলোর মধ্যে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে।
বিশ্বব্যাপী শেয়ার বাজারে এই ধরনের পতন সাধারণত একটি বড় সংকেত, যা পরবর্তী সময়ে সারা বিশ্বের অর্থনীতির জন্য নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষত, যদি ট্রাম্পের শুল্ক পরিকল্পনা দীর্ঘমেয়াদী হয়, তবে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি কমে যেতে পারে এবং বাণিজ্য যুদ্ধ আরও তীব্র হতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে, ব্যবসায়ীরা ও অর্থনীতিবিদরা শুল্কের প্রভাব পর্যালোচনা করছে এবং ভবিষ্যতে বাজারের প্রতিক্রিয়া কী হতে পারে, তা নিয়ে আলোচনা শুরু করেছে।