পোল্যান্ডের প্রতিটি প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষকে সামরিক প্রশিক্ষণ দেওয়ার ঘোষণার পর দেশটির নাগরিকত্বের গুরুত্ব নতুন মাত্রা পেয়েছে। এমনকি হলিউডের তারকারাও এর ব্যতিক্রম নন। সম্প্রতি মার্কিন অভিনেতা জেসি আইজেনবার্গ পোলিশ নাগরিকত্ব লাভের পর প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্ক মজা করে বলেন, “তোমার জন্য এমন প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করব যে, নতুন জেমস বন্ড চরিত্র পেতে আর সমস্যা হবে না!” তবে তিনি আশ্বস্ত করেন যে এই প্রশিক্ষণ স্বেচ্ছাসেবী ভিত্তিতে হবে।
পোল্যান্ড রাশিয়ার উপনিবেশ হিসেবে দুই শতাব্দী কাটানোর অভিজ্ঞতা থেকে এখনো গভীর শঙ্কা বহন করে। ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণাঙ্গ আগ্রাসনের পর সেই উদ্বেগ আরও বেড়েছে। বর্তমানে পোল্যান্ড ন্যাটোর সর্বোচ্চ প্রতিরক্ষা ব্যয়কারী দেশ, যেখানে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৪.৭ শতাংশ প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় করা হচ্ছে। দেশটি বিশাল সামরিক বাহিনী গঠন করছে, যার মধ্যে রয়েছে যুদ্ধবিমান, রকেট, ট্যাংক, কামান ও অন্যান্য আধুনিক সরঞ্জাম।
সামরিক বাহিনীর চিফ অব জেনারেল স্টাফ জেনারেল ভিসলাভ কুকুলা জানান, রাশিয়া ও বেলারুশের সীমানায় অবস্থান করায় পোল্যান্ডের প্রতিরক্ষা কৌশল অন্যদের চেয়ে ভিন্ন। কৌশলগত গভীরতা কম থাকায় তাদের স্বল্প সময়ের মধ্যে প্রস্তুতি নিতে হবে। এজন্য দেশটি সেনাবাহিনীর সংখ্যা পাঁচ লাখে উন্নীত করার পরিকল্পনা করছে এবং কয়েক মিলিয়ন রিজার্ভ সেনাকে প্রশিক্ষণ দিতে চায়।
প্রধানমন্ত্রী টাস্ক জানান, বছরের শেষ নাগাদ এমন একটি মডেল প্রস্তুত করতে চান যাতে প্রতিটি প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষকে যুদ্ধের জন্য প্রশিক্ষিত করা যায়। নারীরাও চাইলে এই প্রশিক্ষণে অংশ নিতে পারবেন। তবে এটি বাধ্যতামূলক নয়, বরং স্বেচ্ছাসেবী ভিত্তিতে পরিচালিত হবে।
প্রাথমিকভাবে সংক্ষিপ্ত সামরিক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি শুরু করা হবে, যেখানে নাগরিকদের সিভিল ডিফেন্স, প্রাথমিক চিকিৎসা এবং সামরিক কৌশল শেখানো হবে। যারা পূর্বে সামরিক প্রশিক্ষণ নিয়েছেন, তাদের জন্য বিশেষ পুনরায় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা থাকবে, যেখানে অস্ত্র ব্যবহারের দক্ষতা, যুদ্ধকালীন চিকিৎসা ও নেভিগেশনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে। এছাড়া মাসব্যাপী প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করা হবে, যা অনলাইনে এবং সরাসরি উভয় মাধ্যমেই গ্রহণ করা যাবে।
সেনাবাহিনীর পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মধ্যে এক লাখ মানুষকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতির পাশাপাশি জনগণের মধ্যে সংকট মোকাবিলার সক্ষমতাও বৃদ্ধি করবে।
তবে অনেক সামরিক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, এই উদ্যোগ দেরিতে নেওয়া হয়েছে এবং প্রশিক্ষণের সংখ্যা আরও বাড়ানো দরকার। কিছু বিশেষজ্ঞ বাধ্যতামূলক সামরিক প্রশিক্ষণ পুনর্বহালের পক্ষে মত দিয়েছেন। এক জরিপে দেখা গেছে, পোল্যান্ডের ৩৯ শতাংশ মানুষ এই প্রশিক্ষণে অংশ নিতে ইচ্ছুক।
অনেকে এই উদ্যোগকে স্বাগত জানালেও কেউ কেউ বলছেন, দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি উন্নত না হলে তারা যুদ্ধের জন্য আত্মনিয়োগ করবেন না। বিশেষজ্ঞদের মতে, জনগণকে উদ্বুদ্ধ করতে আর্থিক প্রণোদনা, কর ছাড় এবং কর্মসংস্থান সংক্রান্ত সুবিধা দেওয়া উচিত।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ওয়াদিস্লাভ কোসিনিয়াক-কামিশ বলেন, “সবাইকে সেনা বানানোর দরকার নেই, তবে সিভিল ডিফেন্স, প্রাথমিক চিকিৎসা ও সংকট মোকাবিলার প্রশিক্ষণ সব নাগরিকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।”
সরকার ইতোমধ্যে স্কুল পর্যায়ে “সেনাবাহিনীর সঙ্গে শিক্ষা” কর্মসূচি চালু করেছে, যাতে শিক্ষার্থীদের নাগরিক প্রতিরক্ষা ও সামরিক বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। সামরিক কর্মকর্তারা মনে করেন, এই প্রস্তুতি রাশিয়াকে যুদ্ধের চিন্তা থেকে বিরত রাখতে পারে এবং এটি একটি কার্যকর প্রতিরোধ হিসেবে কাজ করবে।