মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আন্তর্জাতিক যুদ্ধের অবসান ঘটানোর জন্য একাধিক পদক্ষেপ নিচ্ছেন এবং তাঁর প্রশাসন বর্তমানে রাশিয়ার সঙ্গে একটি সম্ভাব্য চুক্তির জন্য আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। গত মাসে, ট্রাম্প হুমকি দিয়েছিলেন যে রাশিয়ান তেল আমদানি করা দেশগুলোর ওপর ৫০% শুল্ক আরোপ করবেন, যদি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন যুদ্ধবিরতির জন্য সম্মত না হন। এই পদক্ষেপটি আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে এবং তা আরও জোরালোভাবে বিশ্বের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করছে।
রাশিয়ার জন্য শুল্কের অব্যাহতি
অদ্ভুতভাবে, রাশিয়া নতুন শুল্কের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত নয়, যা অনেকেই আশ্চর্যজনক হিসেবে দেখছেন। রাশিয়ান মিডিয়া যেমন রাষ্ট্রীয় চ্যানেল রোসিয়া ২৪ টিভি বলছে যে, এটি কোনও বিশেষ সুবিধার কারণে নয় বরং রাশিয়ার বিরুদ্ধে ইতিমধ্যেই থাকা নিষেধাজ্ঞার কারণে। তারা জানিয়েছে, “রাশিয়ার উপর কোনও নতুন শুল্ক আরোপ করা হয়নি, কিন্তু তা কোনও বিশেষ আচরণের কারণে নয়, এটি কেবলমাত্র পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞাগুলির কারণে যা ইতিমধ্যে আমাদের বিরুদ্ধে রয়েছে।”
রাশিয়ান মিডিয়াগুলি আরও বলছে যে, পশ্চিমের অনেক দেশ এ নিয়ে হতাশ। রোসিয়া ১ এবং অন্যান্য মিডিয়া আউটলেট জানিয়েছে যে পশ্চিমের অনেকেই আশা করছিল যে রাশিয়া শুল্ক তালিকায় থাকবে এবং তাদের এই অনুপস্থিতি হতাশার সৃষ্টি করেছে। মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট এই বিষয়ে মন্তব্য করেছেন যে, “রাশিয়া এবং বেলারুশের সঙ্গে আমাদের কোনো বাণিজ্য নেই, তারা ইতিমধ্যে নিষিদ্ধ।” এর মাধ্যমে তিনি আরো স্পষ্ট করেছেন যে রাশিয়া এবং বেলারুশের বিরুদ্ধে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা কার্যকর রয়েছে এবং সেগুলি এই শুল্ক পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত নয়।
শুল্কের তালিকায় দেশগুলোর প্রতিক্রিয়া
তবে, ট্রাম্পের এই শুল্ক পরিকল্পনা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নতুন দিক নির্দেশনা দেয় এবং বিশেষ করে ইউরোপে এর ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে। ইউরোপীয় দেশগুলো, যারা মার্কিন মিত্র, তারা শুল্কের এই পরিকল্পনার প্রতি নিজেদের মতামত জানিয়েছে। বিশেষ করে, ইউরোপীয় নেতারা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন যে এই পদক্ষেপটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকে সংকটময় পরিস্থিতিতে ঠেলে দেবে এবং এটি তাদের দেশগুলোর জন্য আর্থিক চাপ সৃষ্টি করবে।
বিশ্বের কিছু শক্তিশালী অর্থনৈতিক দেশ, যেমন জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, এবং কানাডা এই শুল্ক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তাদের উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং তারা আশঙ্কা করছে যে এটি বৈশ্বিক বাণিজ্যকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়া ইতিমধ্যে ঘোষণা করেছে যে তারা মার্কিন শুল্কের বিরুদ্ধে তাদের স্বার্থ রক্ষা করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। তবে, চীন ইতিমধ্যেই শুল্ক প্রতিক্রিয়া ঘোষণা করেছে এবং তারা মার্কিন সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে।
বিশ্বব্যাপী বাণিজ্য সংকট এবং তার প্রভাব
ট্রাম্পের শুল্ক পরিকল্পনা কেবল একটি রাজনৈতিক পদক্ষেপ নয়, বরং এটি বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করতে পারে। বিশ্ব বাণিজ্যের বর্তমান পরিস্থিতিতে, যেখানে সরবরাহ শৃঙ্খল এবং বাণিজ্যিক সম্পর্কগুলো সংকটময় হয়ে উঠেছে, এই শুল্ক বৃদ্ধি আরও অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে। শুল্কের ফলে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে মালামাল এবং পণ্যের মূল্য বাড়তে পারে, যা তাদের অর্থনীতিতে আরো চাপ সৃষ্টি করবে।
এছাড়া, ইউরোপীয় দেশগুলোর পাশাপাশি, অন্যান্য উন্নত দেশগুলো যেমন অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড এবং কানাডা এই শুল্ক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তাদের অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যিক খাতের উপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
ইউক্রেনের শুল্ক প্রভাব
এদিকে, ইউক্রেনের জন্যও ১০% শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। ইউক্রেনের প্রথম উপ-প্রধানমন্ত্রী ইউলিয়া স্ভিরিডেঙ্কো জানিয়েছেন যে নতুন শুল্ক প্রধানত ছোট উৎপাদকদের উপর প্রভাব ফেলবে। তিনি আরও বলেছেন, “আমরা আমাদের শর্তগুলো উন্নত করার জন্য কাজ করছি, এবং এই শুল্ক উভয় দেশের জন্যই সুবিধাজনক হতে পারে।” ইউক্রেন ২০২৪ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মোট $৮৭৪ মিলিয়ন মূল্যের পণ্য রপ্তানি করেছে, যা দেশটির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সূচক। তবে, ইউক্রেনের প্রধান উপ-প্রধানমন্ত্রী আরও যোগ করেছেন যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ন্যায্য শুল্ক ব্যবস্থা বাণিজ্যের ক্ষেত্রে উভয় দেশের জন্যই লাভজনক হবে।
বিশ্বব্যাপী আঞ্চলিক শক্তির প্রতিক্রিয়া
এছাড়া, চীন এবং রাশিয়া যেহেতু মার্কিন শুল্কের নতুন পরিকল্পনায় লক্ষ্যবস্তু, তাদের মধ্যে সম্পর্ক আরও জটিল হতে পারে। বিশেষ করে, চীন ইতিমধ্যেই প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যে তারা মার্কিন সিদ্ধান্তের প্রতিক্রিয়া জানাবে। এমনকি, রাশিয়ার রাষ্ট্রপতি ভ্লাদিমির পুতিনও শুল্কের প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেছেন যে এই ধরনের পদক্ষেপ বিশ্ব বাণিজ্যে অস্থিরতা সৃষ্টি করবে এবং এটি আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
Last words
ট্রাম্পের শুল্কের সিদ্ধান্ত, বিশ্ব বাণিজ্য এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ওপর গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। এটি শুধু বাণিজ্যিক সম্পর্কই নয়, রাজনৈতিক মিত্রতাও পরীক্ষা করে দেখতে পারে। তবে, শুল্কের এই সিদ্ধান্ত কেবল বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্যই নয়, প্রতিটি দেশ ও তাদের জনগণের জন্যও বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হতে পারে।