Gaibandha Correspondent:
গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলায় একটি বিয়েবাড়িতে ‘নরম ভাত’ পরিবেশনকে কেন্দ্র করে বরপক্ষের তাণ্ডবের ঘটনা ঘটেছে। বৃহস্পতিবার (৩ এপ্রিল) দিবাগত রাতে উপজেলার পশ্চিম ছাপড়হাটি হাজীপাড়া গ্রামে কনের বাড়িতে এ ঘটনা ঘটে। এসময় বরপক্ষ চেয়ার ভাঙচুর, ভাতের প্লেট ছুড়ে ফেলা, গালাগালি ও মারধরের মতো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি তৈরি করে। এতে কনের জ্যাঠা আহত হন এবং বরপক্ষের একাধিক ব্যক্তি আটক হন। শেষ পর্যন্ত বিয়ের পর পরই সংসার ভেঙে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হন দুই পক্ষ।
ঘটনার সূচনা: গেট মানি নিয়ে টানাপোড়েন
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, কনের বাড়ির গেট মানি নিয়ে শুরু হয় প্রথম দ্বন্দ্ব। বরপক্ষ টাকা কম দেয় বলে অভিযোগ ওঠে, ফলে উত্তেজনা শুরু হয় দুই পক্ষের মধ্যে। যদিও পরিস্থিতি সাময়িকভাবে নিয়ন্ত্রণে আসে এবং বর ও কনের বিয়ে সম্পন্ন হয়। কিন্তু বিয়ের অনুষ্ঠান ঘিরে জমে ওঠা অভ্যর্থনায় ফের ছন্দপতন ঘটে।
নরম ভাত ও রাতের খাবার নিয়ে অভিযোগ
রাতে আনুমানিক ১টার দিকে প্রায় তিন শতাধিক বরযাত্রীকে খাবার পরিবেশন করা হয়। গরমে ও সময়ের কারণে রান্না করা ভাত কিছুটা নরম হয়ে যায়। সেই ভাত খাওয়ার সময় বরপক্ষ অস্বস্তি প্রকাশ করে এবং একপর্যায়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ভাতের প্লেট ছুঁড়ে ফেলে দিতে শুরু করেন অনেকেই। তখনই শুরু হয় চেয়ার ভাঙচুর, গালাগালি ও বিশৃঙ্খলা।
মারধর ও আহত ব্যক্তি
কনের বাবার অনুপস্থিতিতে বিয়ের যাবতীয় আয়োজন তদারক করছিলেন কনের জ্যাঠা দুলা মিয়া। বরপক্ষের লোকজন তাকে কলার ধরে ফেলে দেন এবং কিল-ঘুষি মারেন। একপর্যায়ে মাথায় আঘাতপ্রাপ্ত হন তিনি। স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। প্রাথমিক চিকিৎসার পর তিনি বাড়ি ফিরে আসেন।
নগদ গহনা বদলানোর অভিযোগ
কনের চাচি রুমানা বলেন, “বিয়ের পরপরই কনের গায়ে থাকা আসল সোনার গহনা খুলে ফেলে কনের ননদ তাকে সিটিগোল্ডের গহনা পরিয়ে দেন। এতেই কনে ও তার পরিবারের মাঝে সন্দেহ ও ক্ষোভ তৈরি হয়।” এ ঘটনা ভাত বিতর্কের সঙ্গে মিলেমিশে সংঘর্ষে রূপ নেয়।
স্থানীয়দের হস্তক্ষেপ ও আটক
এলোপাতাড়ি হামলার সময় এলাকাবাসী এগিয়ে এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। তখন ছয়টি অটোরিকশাসহ বরপক্ষের বেশ কয়েকজনকে আটক করা হয়। তবে বর সবুজ সরকার এবং তার বাবা আয়নাল হককে ঘটনাস্থলে পাওয়া যায়নি এবং তাদের মোবাইল নম্বরেও যোগাযোগ করা যায়নি।
প্রশাসনের অবস্থান
ঘটনার পর ছাড়পহাটি ইউনিয়নের ইউপি সদস্য সাইফুল ইসলাম দুদু জানান, “ঘটনার খবর পেয়ে শুক্রবার সকাল ১০টার দিকে আমি ও আরও দুই ইউনিয়নের চেয়ারম্যানসহ কয়েকজন মিলে বসি। আলোচনার ভিত্তিতে একটি মীমাংসাপত্রও তৈরি করা হয়। কিন্তু দুই পক্ষ সিদ্ধান্তে আসেন, এই পরিস্থিতিতে সংসার চালানো সম্ভব নয়।”
ইউএনওর প্রতিক্রিয়া
সুন্দরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রাজ কুমার বিশ্বাস বলেন, “বিয়ে বাড়িতে অপ্রীতিকর ঘটনার বিষয়ে আমি লোকমুখে শুনেছি। পরে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের শান্তিপূর্ণভাবে বিষয়টি সমাধানের নির্দেশনা দিয়েছি।”
এই ঘটনা শুধু একটি বিয়ে নয়, বরং গ্রামীণ সমাজে পারিবারিক অনুষ্ঠান ঘিরে কতটা উত্তেজনা তৈরি হতে পারে, তারই প্রতিফলন। নরম ভাতের মতো একটি তুচ্ছ কারণ থেকে সংঘর্ষ, গহনা বদল, ভাঙচুর এবং অবশেষে একটি সদ্য শুরু হওয়া সংসারের ইতি—সব মিলিয়ে এটি এক দুঃখজনক সামাজিক চিত্র।