ইংরেজ গৃহযুদ্ধ (১৬৪২-১৬৫১)
ইংরেজ গৃহযুদ্ধ ছিল ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড ও আয়ারল্যান্ডজুড়ে সংঘটিত এক ধারাবাহিক সামরিক ও রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব। এটি মূলত রাজতন্ত্রবাদী (Royalists) এবং সংসদীয় শাসনবাদীদের (Parliamentarians) মধ্যে সংঘটিত হয়, যার কেন্দ্রবিন্দু ছিল ইংল্যান্ডের শাসনব্যবস্থা—রাজা একচ্ছত্র শাসন চালিয়ে যাবেন, নাকি সংসদ অধিক ক্ষমতা পাবে।
এই যুদ্ধ ইংল্যান্ডের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক হিসেবে চিহ্নিত হয়, কারণ এর ফলে দেশের শাসনব্যবস্থায় রাজশক্তির পরিবর্তে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা সুপ্রতিষ্ঠিত হয়।
🔹 যুদ্ধের কারণ

ইংরেজ গৃহযুদ্ধের মূল কারণ ছিল রাজা প্রথম চার্লস ও ব্রিটিশ সংসদের মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব। চার্লস বিশ্বাস করতেন দেবদত্ত রাজত্বের অধিকার (Divine Right of Kings) তত্ত্বে, যার মাধ্যমে তিনি সংসদের অনুমতি ছাড়াই শাসন করতে চেয়েছিলেন। অন্যদিকে, সংসদ চেয়েছিল রাজাকে সংবিধান অনুযায়ী শাসন পরিচালনা করতে বাধ্য করতে।
রাজা চার্লস যখন সংসদের অনুমতি ছাড়া কর আদায় করতে শুরু করেন, তখন সংসদ তার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়। বিশেষ করে “পিটিশন অব রাইটস” (Petition of Rights, ১৬২৮) নামে একটি দলিল জারি করা হয়, যেখানে বলা হয় রাজা সংসদের অনুমতি ছাড়া কর আদায় করতে পারবেন না। চার্লস প্রথম এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেন এবং সংসদ বিলুপ্ত করেন, যা “১১ বছরের স্বৈরতন্ত্র” (Eleven Years’ Tyranny, ১৬২৯-১৬৪০) নামে পরিচিত।
তবে ১৬৪০ সালে স্কটল্যান্ডের সাথে যুদ্ধের জন্য অর্থের প্রয়োজন হলে, চার্লস সংসদ আহ্বান করতে বাধ্য হন। কিন্তু সংসদ তার অনিয়ন্ত্রিত শাসনের সমালোচনা করে এবং তার ক্ষমতা সীমিত করার উদ্যোগ নেয়। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে চার্লস ১৬৪২ সালে তার ব্যক্তিগত বাহিনী নিয়ে সংসদ আক্রমণ করার চেষ্টা করেন, যা সরাসরি গৃহযুদ্ধের সূচনা করে।
🔹 যুদ্ধের পর্যায়সমূহ
প্রথম ইংরেজ গৃহযুদ্ধ (১৬৪২-১৬৪৬)
- এই পর্যায়ে রাজতন্ত্রবাদী এবং সংসদীয় বাহিনীর মধ্যে সরাসরি লড়াই শুরু হয়।
- সংসদীয় বাহিনীকে নেতৃত্ব দেন অলিভার ক্রমওয়েল এবং তার “নিউ মডেল আর্মি” (New Model Army).
- ১৬৪৫ সালের ন্যাসবি যুদ্ধ (Battle of Naseby) ছিল এই পর্যায়ের প্রধান যুদ্ধ, যেখানে সংসদীয় বাহিনী বিজয়ী হয়।
- পরাজয়ের পর ১৬৪৬ সালে প্রথম চার্লস স্কটিশ বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করেন।
দ্বিতীয় ইংরেজ গৃহযুদ্ধ (১৬৪৮-১৬৪৯)

- ১৬৪৭ সালে স্কটিশদের সাহায্যে রাজা চার্লস পুনরায় যুদ্ধ শুরু করেন।
- সংসদীয় বাহিনী আবারও জয়ী হয় এবং ১৬৪৮ সালে রাজা চার্লসকে বন্দি করা হয়।
- ১৬৪৯ সালে প্রথম চার্লসকে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় এবং তাকে গিলোটিনে শিরশ্ছেদ করা হয়, যা ব্রিটিশ ইতিহাসে এক যুগান্তকারী ঘটনা।
- রাজতন্ত্র বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয় এবং ইংল্যান্ডকে প্রজাতন্ত্র (Commonwealth) ঘোষণা করা হয়।
তৃতীয় ইংরেজ গৃহযুদ্ধ (১৬৪৯-১৬৫১)

- রাজা প্রথম চার্লসের মৃত্যুর পর তার পুত্র দ্বিতীয় চার্লস স্কটল্যান্ডে সমর্থন পান এবং তিনি ইংল্যান্ডের সিংহাসন পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করেন।
- অলিভার ক্রমওয়েল স্কটল্যান্ড আক্রমণ করেন এবং স্কটিশদের পরাজিত করেন।
- ১৬৫১ সালের ওরচেস্টারের যুদ্ধে (Battle of Worcester) সংসদীয় বাহিনী চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করে এবং দ্বিতীয় চার্লস ফ্রান্সে পালিয়ে যান।
🔹 যুদ্ধের প্রধান ফলাফল
১. রাজতন্ত্রের পতন ও প্রথম চার্লসের মৃত্যু
- ১৬৪৯ সালে প্রথম চার্লসকে ফাঁসি দেওয়ার মাধ্যমে ইংল্যান্ডের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কোনও রাজাকে হত্যা করা হয়।
- রাজতন্ত্র বিলুপ্ত করা হয় এবং প্রজাতন্ত্র (Commonwealth) গঠন করা হয়.
২. অলিভার ক্রমওয়েলের উত্থান
- অলিভার ক্রমওয়েল ১৬৫৩ সালে নিজেকে “লর্ড প্রটেক্টর” (Lord Protector) ঘোষণা করেন এবং কার্যত একনায়কতন্ত্র চালু করেন।
৩. সংসদীয় শাসনের উত্থান
- এই যুদ্ধ প্রমাণ করে যে রাজা একক ক্ষমতায় দেশ শাসন করতে পারবেন না এবং তাকে সংসদের সঙ্গে ক্ষমতা ভাগ করে নিতে হবে।
৪. ১৬৬০ সালে রাজতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা
- ক্রমওয়েলের মৃত্যুর পর ১৬৬০ সালে দ্বিতীয় চার্লস ইংল্যান্ডের সিংহাসনে পুনরায় বসেন এবং রাজতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়।
- তবে এরপর রাজাদের ক্ষমতা সীমিত করা হয় এবং সংসদের অনুমতি ছাড়া কোনও রাজা আর এককভাবে শাসন করতে পারেননি.
🔹 ইংরেজ গৃহযুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব
- ব্রিটেনের সংসদীয় গণতন্ত্রের ভিত্তি স্থাপন করে.
- রাজাদের সীমাহীন ক্ষমতা চিরতরে শেষ হয় এবং সংবিধান অনুযায়ী রাজাদের শাসন করতে হয়।
- ভবিষ্যতে গ্লোরিয়াস বিপ্লব (১৬৮৮) and সংবিধানিক রাজতন্ত্রের (Constitutional Monarchy) জন্ম দেয়.
ইংরেজ গৃহযুদ্ধ শুধুমাত্র রাজা ও সংসদের মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ছিল না, এটি ছিল গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার জন্য এক যুগান্তকারী লড়াই। এই যুদ্ধের ফলে ব্রিটিশ শাসনব্যবস্থার ভবিষ্যৎ স্থির হয় এবং একচ্ছত্র রাজতন্ত্রের দিন শেষ হয়ে যায়। এটি শুধু ইংল্যান্ড নয়, পরবর্তীতে বিশ্বের অন্যান্য গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার জন্যও অনুপ্রেরণা হয়ে দাঁড়ায়।