বাংলাদেশের অর্থনীতি ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে, তবে মুদ্রাস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকট এবং বৈশ্বিক বাজারের অনিশ্চয়তা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো বলছে, দেশটির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি স্বাভাবিক হলেও কিছু কাঠামোগত দুর্বলতা দ্রুত সমাধান করা প্রয়োজন।
🔹 প্রবৃদ্ধি ও মুদ্রাস্ফীতি
বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৫.৮% থেকে ৬%। যদিও সরকার ৭% প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে, তবে অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ সংকটের কারণে এটি অর্জন করা কঠিন হবে।
✅ মূল কারণ:
- বৈশ্বিক বাজারে রপ্তানি প্রবৃদ্ধির ধীরগতি
- রেমিট্যান্স প্রবাহে অস্থিরতা
- মূল্যস্ফীতি ৯% এর ওপরে রয়ে গেছে
- ডলার সংকটে আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়া
🔹 ডলার সংকট ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ২০ বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে এসেছে, যা দুই বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।
📌 ডলার সংকটের মূল কারণ:
- আমদানি ব্যয় নিয়ন্ত্রণে সরকারের কঠোর নীতিমালা
- আন্তর্জাতিক ঋণের কিস্তি পরিশোধের চাপ
- রপ্তানি আয়ে নিম্নগতি
- হুন্ডির মাধ্যমে টাকা পাঠানোর কারণে বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স কম আসা
এই সংকট নিরসনে বাংলাদেশ ব্যাংক রপ্তানিকারকদের জন্য প্রণোদনা এবং ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে ডলারের যোগান বাড়ানোর উদ্যোগ নিচ্ছে।
🔹 পোশাক খাতের চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা
বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি তৈরি পোশাক (RMG) খাত। কিন্তু বৈশ্বিক মন্দার প্রভাবে এ খাতে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ১০-১৫% কমে গেছে। ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ভোক্তাদের ব্যয় সংকোচনের কারণে পোশাকের চাহিদা কমেছে।
✅ এদিকে আশার আলো:
- মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার নতুন বাজারে রপ্তানি বৃদ্ধি
- গ্রিন ফ্যাক্টরির সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আকৃষ্ট করছে
- সরকার কর সুবিধা ও সহজ ঋণের মাধ্যমে উদ্যোক্তাদের সহায়তা দিচ্ছে
🔹 রেমিট্যান্স প্রবাহ
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে রেমিট্যান্স অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খাত। ২০২৩ সালে প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ ২১ বিলিয়ন ডলার ছিল, তবে এটি পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় কিছুটা কম।
📌 মূল চ্যালেঞ্জ:
- হুন্ডি ব্যবসা জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে, ফলে ব্যাংকিং চ্যানেলে টাকা আসছে কম
- মধ্যপ্রাচ্যে কর্মসংস্থান সংকুচিত হচ্ছে
- প্রবাসী শ্রমিকদের জন্য ব্যয় বাড়ায় অনেকেই বিদেশে যেতে আগ্রহ হারাচ্ছেন
সরকার রেমিট্যান্সে প্রণোদনা বাড়ানোর পাশাপাশি বিদেশে দক্ষ কর্মী পাঠানোর পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে।
🔹 বিনিয়োগ ও রাজস্ব সংকট
বাংলাদেশে বেসরকারি বিনিয়োগ ৩০% এর নিচে নেমে এসেছে, যা অর্থনীতির জন্য দীর্ঘমেয়াদে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
✅ বিনিয়োগ কমার কারণ:
- ব্যবসা পরিচালনায় উচ্চ সুদের হার
- আমদানি ব্যয় বাড়ায় কাঁচামালের সংকট
- রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা
অন্যদিকে, রাজস্ব ঘাটতি বাড়ছে। কর আদায়ের হার এখনো নিম্নমানের এবং বাজেট ঘাটতি পূরণে সরকারকে বৈদেশিক ঋণের উপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
🔹 ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও সুপারিশ
✅ সরকারের গৃহীত পদক্ষেপ:
- রপ্তানি বাজারে বৈচিত্র্য আনা
- রেমিট্যান্সে প্রণোদনা বৃদ্ধি
- বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে নীতি সংস্কার
- আইএমএফের সহায়তা নিয়ে আর্থিক খাত পুনর্গঠন
✅ বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ:
- রিজার্ভ সংকট মোকাবিলায় আমদানি নীতিতে ভারসাম্য আনা
- রপ্তানির নতুন বাজার অনুসন্ধান করা
- বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা
- শক্তিশালী আর্থিক নীতি প্রণয়ন করা
বাংলাদেশের অর্থনীতি এখনো সম্ভাবনাময়, তবে টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে কাঠামোগত সংস্কার জরুরি। আগামী কয়েক মাসেই বোঝা যাবে, সরকার ও অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারকরা কতটা সফলভাবে সংকট মোকাবিলা করতে পারবেন।