সুলতান মাহমুদ, দিনাজপুর :
দিনাজপুরের লিচু বাগানজুড়ে এখন যেন উৎসবের আমেজ। সবুজ পাতার আড়ালে থোকায় থোকায় ঝুলছে লিচুর মুকুল। কোথাও হালকা বাতাসে দুলছে মুকুলের ডাল, কোথাও মৌমাছির গুনগুন শব্দে মুখর বাগান। প্রকৃতির এই বার্তাই জানিয়ে দিচ্ছে—আর অল্প কিছুদিনের মধ্যেই ফুটবে কাঙ্ক্ষিত লিচুর ফুল, শুরু হবে গুটি ধরা।
জেলার বিভিন্ন লিচু বাগানে ঘুরে দেখা যায়, চাষিদের দম ফেলার সময় নেই। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত তারা ব্যস্ত পরিচর্যায়। কেউ সেচ মেশিন বসিয়ে পানি দিচ্ছেন, কেউ মুকুল রক্ষায় স্প্রে করছেন, আবার কেউ গাছের গোড়ায় জৈব ও রাসায়নিক সার প্রয়োগ করছেন।
চাষিদের প্রত্যাশা—অনুকূল আবহাওয়া থাকলে এ বছর ফলন গতবারের তুলনায় অনেক বেশি হবে। লিচুর জন্য খ্যাত দিনাজপুরের মাধববাটি, মাসিমপুর ও উলিপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় এখন মুকুলের সমারোহ। বিশেষ করে জিআই স্বীকৃত বেদানা লিচু এই জেলার পরিচিতি বহন করে। পাশাপাশি চায়না থ্রি, মাদ্রাজি, বোম্বাই, কাঠালীসহ নানা জাতের লিচুর চাষও হচ্ছে ব্যাপকভাবে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, দিনাজপুরে মোট ৫ হাজার ৪৮৪ হেক্টর জমিতে ছোট-বড় মিলিয়ে ১০ হাজার ৬৮টি লিচু বাগান রয়েছে। এর মধ্যে ৩ হাজার ২২৫ হেক্টরে বোম্বাই, ১ হাজার ৯৯০ হেক্টরে মাদ্রাজি, ৭০৯ হেক্টরে চায়না থ্রি, ৩০৮ হেক্টরে বেদানা, ১২৮ হেক্টরে চায়না-২, ২৪.৫ হেক্টরে কাঠালী এবং ০.২৬ হেক্টরে মুজাফফরি জাতের লিচু আবাদ হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, প্রকৃতি ও পরিচর্যা—দুইয়ের সমন্বয়ে দিনাজপুরের লিচু বাগানগুলোতে এখন আশার আলো। চাষিদের চোখে স্বপ্ন, বাগানে ব্যস্ততা আর মুকুলে ভরা ডাল—সবই ইঙ্গিত দিচ্ছে, সামনে আসছে আরেকটি সম্ভাবনাময় লিচু মৌসুম।
দিনাজপুর মাসিমপুর এলাকার চাষি মফিজুর রহমান জানান, আমার এ বছর ২৫টি বেদানা জাতের গাছ আছে। সবগুলোতেই মুকুল এসেছে। শীতের তীব্রতা কম আর রোদের তাপমাত্রা স্বাভাবিক থাকায় ফলন ভালো হবে বলে আশা করছি। তবে আমরা নিয়মিত কীটনাশক স্প্রে করছি। আবহাওয়া এমন থাকলে গুটি ভালো হবে।
উলিপুর গ্রামের চাষি হারানো রশিদ বলেন, মুকুলে ধুলাবালি জমে পোকা হওয়ার আশঙ্কা থাকে, তাই স্প্রে করেছি। আমার লিজ নেওয়া ১০০ গাছের মধ্যে কিছু গাছে নতুন পাতা এসেছে, এতে সামান্য ক্ষতি হবে। তবে সামগ্রিকভাবে এ বছর মুকুল অনেক বেশি—ফলন ভালো হওয়ার আশা করছি।
বিরলের মাধববাটি এলাকার লিচু চাষি শফিকুল ইসলাম বলেন, “গত বছরের তুলনায় এবার মুকুল প্রায় দ্বিগুণ। আমরা এখন পানি ও জৈব সার ব্যবস্থাপনায় জোর দিচ্ছি। যদি কালবৈশাখী ঝড় বা অতিরিক্ত গরম না পড়ে, তাহলে বাজারে ভালো দামও পাওয়া যাবে বলে আশা করছি।
মাধববাটির চাষি রেজাউল করিম যোগ করেন, লিচুর মুকুল আসার সময়টাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আমরা কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শ মেনে চলছি। গাছের গোড়ায় নিয়মিত পানি দিচ্ছি এবং পাতায় স্প্রে করছি। আবহাওয়া সহায়ক থাকলে এবার রেকর্ড ফলন হতে পারে।
দিনাজপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক আফজাল হোসেন বলেন, ফেব্রুয়ারির শেষ দিক থেকে মুকুল আসা শুরু হয়েছে এবং এখনো প্রক্রিয়া চলছে। আমাদের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা মাঠে কাজ করছেন এবং চাষিদের নিয়মিত পরামর্শ দিচ্ছেন।
তিনি আরও বলেন, এই সময় গাছের গোড়ায় পর্যাপ্ত পানি রাখা খুব জরুরি। বর্তমানে হালকা খরাভাব রয়েছে, তাই সেচ বাড়াতে বলা হচ্ছে। পাশাপাশি পাতায় হালকা স্প্রে এবং রাসায়নিক সারের সঙ্গে জৈব সার ব্যবহার করলে গুটি ভালো হয়। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে দিনাজপুরে এ বছর রেকর্ড পরিমাণ লিচু উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে।

