বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ (বিপিএল) মাঠের খেলার বাইরে আবারও আলোচনায় এসেছে আর্থিক অনিয়ম ও খেলোয়াড়দের প্রাপ্য সম্মানী না পাওয়ার বিষয়টি। মিরপুর শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে বুধবার আলোচনার কেন্দ্রে ছিল বৈশ্বিক ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগের র্যাঙ্কিংয়ে বিপিএলের অবস্থান এবং তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা। আন্তর্জাতিক পর্যালোচনায় বিপিএলকে দশম বা সর্বশেষ স্থানে রাখা হয়েছে, যা বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) কর্মকর্তাদের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি করেছে।
বিপিএল গভর্নিং কাউন্সিলের সদস্যসচিব ইফতেখার রহমান মিঠু এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করেননি। তবে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে বিপিএলকে বিশ্বের শীর্ষ পাঁচ ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগের কাতারে নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তার মতে, আগের আসরগুলোতে একাধিক ফ্র্যাঞ্চাইজি নিয়ম লঙ্ঘন করেছে এবং ইন্টেগ্রিটি ইস্যুতেও ঘাটতি ছিল। যদিও চলতি আসরে সেই জায়গাগুলোতে কিছুটা উন্নতি হয়েছে বলে মনে করছেন আয়োজকরা।
তবে ইন্টেগ্রিটির উন্নতির দাবি থাকলেও খেলোয়াড়দের পারিশ্রমিক পরিশোধ নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে ঢাকা ক্যাপিটালসের ক্রিকেটারদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দলটির খেলোয়াড়রা চুক্তির মোট টাকার মাত্র ২৭ শতাংশ পেয়েছেন। ক্রিকেটারদের ভাষ্য অনুযায়ী, লিগের শুরুতে তারা ২৫ শতাংশ সম্মানী পেয়েছিলেন। এরপর টুর্নামেন্ট শেষ হলে প্রত্যেককে দুই লাখ টাকা করে দেওয়া হয়েছে। অথচ চুক্তি অনুযায়ী ১০ জানুয়ারির মধ্যে মোট সম্মানীর অন্তত ৭৫ শতাংশ পরিশোধ করার বাধ্যবাধকতা ছিল।
এই বিষয়ে জানতে ঢাকা ক্যাপিটালসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আতিক ফাহাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। ক্রিকেটারদের অভিযোগ, বারবার ফোন দেওয়া হলেও তিনি কল রিসিভ করছেন না। এক ক্রিকেটার জানান, পারিশ্রমিক না পেয়ে বিদেশি তারকা ইমাদ ওয়াসিম ক্ষুব্ধ হয়ে দেশে ফিরে গেছেন।
বিসিবি সূত্র জানায়, দেশি ও বিদেশি ক্রিকেটাররা চাইলে বোর্ডের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ জানাতে পারেন। শুধু ঢাকা নয়, বিপিএল শেষ হওয়ার পরও নোয়াখালী এক্সপ্রেসের খেলোয়াড়দের বড় অংশ এখনো বেতন পাননি। দলটির ক্রিকেটারদের দেওয়া চেক বাউন্স করার ঘটনাও ঘটেছে। পরে নোয়াখালী এক্সপ্রেস বিসিবির কাছে আবেদন করে তাদের জমা রাখা দুই কোটি টাকার পে-অর্ডার থেকে খেলোয়াড়দের বকেয়া পরিশোধের অনুরোধ জানিয়েছে। একই ধরনের আবেদন সিলেট টাইটান্সের পক্ষ থেকেও আসতে পারে বলে জানা গেছে, যদিও দলটি বিসিবির কাছে মাত্র দেড় কোটি টাকার ব্যাংক জামানত জমা দিয়েছে।
লিগের নিয়ম অনুযায়ী, গ্রুপ পর্ব শেষ হওয়ার আগেই খেলোয়াড়দের অন্তত ৭৫ শতাংশ সম্মানী পরিশোধ করার কথা থাকলেও বাস্তবে অধিকাংশ ফ্র্যাঞ্চাইজি সেই নিয়ম মানছে না। এ প্রসঙ্গে ইফতেখার রহমান মিঠু বলেন, ঢাকা ক্যাপিটালসের পক্ষ থেকে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক আবেদন পাওয়া যায়নি। সব ফ্র্যাঞ্চাইজির আর্থিক তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। যাচাই শেষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি জানান, ঢাকার বিপক্ষে বিসিবির কাছে পাঁচ কোটি টাকার ব্যাংক জামানত রয়েছে। প্রয়োজন হলে সেই জামানত ভেঙে দেশি ও বিদেশি ক্রিকেটারদের বকেয়া পরিশোধ করা হবে।
বিসিবির হিসাব অনুযায়ী, নোয়াখালী এক্সপ্রেসের দেশি ক্রিকেটারদের প্রায় দুই কোটি তিন লাখ টাকা এখনও বকেয়া রয়েছে। বিদেশি ক্রিকেটারদের পাওনা সম্পর্কেও খোঁজ নেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে, রংপুর রাইডার্স দেশি ক্রিকেটারদের ৫০ শতাংশ সম্মানী ইতোমধ্যে পরিশোধ করেছে এবং বাকি টাকা আগামী সপ্তাহে দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন দলটির একজন কর্মকর্তা। উল্লেখ্য, একমাত্র রংপুরই বিসিবিতে ১০ কোটি টাকার ব্যাংক জামানত জমা দিয়েছে।
অন্যদিকে, কোনো পে-অর্ডার বা ব্যাংক জামানত ছাড়াই অংশ নেওয়া রাজশাহী ওয়ারিয়র্স এবারের বিপিএলের চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। দলটির কোচ হান্নান সরকার জানান, ফাইনালের আগেই ক্রিকেটারদের বড় অংশের পারিশ্রমিক পরিশোধ করা হয়েছে। চট্টগ্রাম রয়্যালসের খেলোয়াড়, কোচিং ও সাপোর্ট স্টাফদের বেতন বিসিবি পরিশোধ করবে বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, ফলে তাদের মধ্যে আর্থিক অনিশ্চয়তা নেই।
সব মিলিয়ে বিপিএলের মাঠের সাফল্যের আড়ালে আর্থিক শৃঙ্খলা ও ফ্র্যাঞ্চাইজি ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। খেলোয়াড়দের সম্মানী নিশ্চিত না হলে ভবিষ্যতে লিগের গ্রহণযোগ্যতা আরও সংকটে পড়তে পারে—এমন শঙ্কাই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে ক্রিকেটাঙ্গনে।

