নাজমুল হোসেন, ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি:
চারদিকে সবুজ ফসলের মাঠ, পাশে ছোট দুটি পুকুর আর সামনে কয়েকটি বসতঘর—প্রকৃতির শান্ত পরিবেশের মাঝেই পুকুরপাড়ে দাঁড়িয়ে আছে একটি ভাঙাচোরা ঘর। মাটির চার দেয়াল, ভাঙা টিনে ঘেরা, উপরে ঢেউটিনের ছাউনি—যা আবার চাপা দেওয়া হয়েছে গাছের ডাল দিয়ে। দূর থেকে দেখলে মনে হয় পাখির বাসা, কাছে গেলে বোঝা যায়—এটাই মানুষের বসবাসের জায়গা।
ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈল উপজেলার হোসেনগাঁও ইউনিয়নের জাবড়াকুড়া এলাকায় এমন মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন প্রায় ৪৫ বছর বয়সী দেলোয়ার হোসেন। প্রতিবন্ধী সন্তানকে নিয়েই তার প্রতিদিনের সংগ্রাম।
সরেজমিনে দেখা যায়, ভাঙা ঘরের এক পাশে একটি চৌকি, পাশে একটি ছোট টেবিল, আর এক কোণে টিউবওয়েল। সেই ঘরেই তাদের বসবাস। প্রাকৃতিক কাজ সারতেও যেতে হয় খোলা মাঠে। নেই কোনো ন্যূনতম স্যানিটেশন ব্যবস্থা।

দেলোয়ার হোসেন জানান, তার ছেলে বকুল যখন মাত্র দুই বছরের, তখনই মারা যান তার স্ত্রী। শিশুটিকে রেখে স্ত্রীর মৃত্যু তাকে ভেঙে দিলেও দ্বিতীয় বিয়ে করেননি তিনি। তার আশঙ্কা ছিল—নতুন সংসারে প্রতিবন্ধী সন্তানটি অবহেলার শিকার হতে পারে।
স্ত্রীর মৃত্যুর পর বকুলকে লালন-পালন করেন দেলোয়ারের মা। কিন্তু পরে তার মায়ের মৃত্যু হলে পুরো দায়িত্ব এসে পড়ে তার কাঁধে। তখন থেকেই শুরু হয় তার কঠিন জীবনসংগ্রাম।
ছেলের চিকিৎসার জন্য বাবার দেওয়া সামান্য সম্পত্তিও বিক্রি করে দিয়েছেন দেলোয়ার। এখন মাত্র ৬ শতক জমির ওপর ভাঙাচোরা একটি ঘর তুলে দিনমজুরির আয়ে কোনোভাবে বেঁচে আছেন তারা।
স্থানীয়রা জানান, প্রতিবন্ধী সন্তানের সব কাজই নিজ হাতে করতে হয় দেলোয়ারকে। ঝড়-বৃষ্টির সময় ঘরটি ভেঙে পড়ার আশঙ্কা থাকে, যা তাদের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করেছে।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে দেলোয়ার হোসেন বলেন, “আমার কোনো সম্পত্তি নেই, কোনো সম্পদ নেই—আছে শুধু আমার সন্তান। ছেলের প্রতিবন্ধী ভাতাটাও বন্ধ হয়ে গেছে। যা আয় করি, তা দিয়ে কষ্টে দিন পার করি। সামনে ঈদ, অথচ মা-হারা ছেলেটাকে একটি নতুন কাপড়ও কিনে দিতে পারিনি।”

