হাবিব আহমেদ, রাজশাহী প্রতিনিধি:
রাজশাহীতে জ¦ালানী তেলের সংকট নিয়ে তেলেসমাতি খেলা শুরু হয়েছে। ফিলিং স্টেশন ও ডিপো মালিকরা মূলত এই খেলা শুরু করেছে। এতে চরম অরাজকতা সৃষ্টি হয়েছে যানবাহনসহ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোতে।
তেল সংকটের কারণে অঘোষিতভাবে বেড়েছে যানবাহনের ভাড়া, বেড়েছে দ্রব্যমূল্যের দাম। বিশেষ করে যানবাহনে এ অরাজকতা বেশি দেখা যাচ্ছে। ঈদের আগে ও পরের দিনগুলো জ¦ালানী তেলের এতোটাই সংকট সৃষ্টি করা হয়েছে যে অনেক চালক মোটরসাইকেল চালানো বন্ধ করে দিয়েছেন। আবার তেল পাওয়ার আশায় দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে তেল সংগ্রহ করছেন চালকরা।
শুধু পেট্রোল, অটেন নয়, খোদ ডিজেলও সংকট সৃষ্টি হয়েছে। এতে কৃষকরা পড়েছেন মহাবিপাকে। তেল না পেয়ে সেচ কাজ চালাতে পারছেন না কৃষকরা। বিশেষ করে তেল সংকটেরে জন্য কৃষির উৎপাদন নিয়ে শঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। তবে ক্রেতাদের প্রশ্ন, এতো তেল আসছে, কিন্তু যাচ্ছে কোথায়। সরকার থেকে বলা হচ্ছে তেলের কোনো সংকট নেই। তাহলে সংকট সৃষ্টি করছে কারা? কিন্তু এসব প্রশ্নে উত্তর দিচ্ছে না পাম্প মালিকরা। রাজশাহীতে ৪৪টি ফিলিং স্টেশন ও ডিপো থাকার পর তেল না পেয়ে ফুসছে সাধারণ মানুষ। তবে রাজশাহীর তেলের পাম্পগুলোতে বিজিবি মোতায়েন করে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
রাজশাহীর বাস টার্মিনাল এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, খাতা কলমে নিয়মের মধ্যেই দুরপাল্লার বাসের টিকিট বিক্রি হচ্ছে। কিন্তু অঘোষিতভাবে যাত্রীদের কাছ থেকে রুট ভেদে বেশি ভাড়া নেয়া হচ্ছে। ঈদের আগে রাজশাহী থেকে চট্টগ্রাম যেতে একজন যাত্রীকে মূল ভাড়ার সাথে গুনতে হয়েছে অতিরিক্ত ৫ থেকে ৬শ’ টাকা। সিলেটের ভাড়াও ঠিক একই আদলে নেয়া হয়েছে। ঈদ শেষ হলেও অঘোষিত ভাড়ার কমেনি। এখনো তেল সংকটের ওযুহাতে এই দুই রুটে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। তবে রাজশাহী থেকে ঢাকার রুটে কয়েকটি কোম্পানীর বাস ছাড়া বেশিরভাগ বাসেই ১শ’ থেকে দেড়শ টাকা পর্যন্ত ভাড়া বেশি নেয়া হচ্ছে। শুধু দুরপাল্লার বাস নয়, লোকাল বাসে চলছে আরো বেশি অরাজকতা। রাজশাহী থেকে নওগাঁ রুটে অঘোষিত ভাড়া বেড়েছে ৩০ থেকে ৫০ টাকা, রাজশাহীর হতে তানোর হয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁয়ের বিভিন্ন উপজেলায় চলাচল করা বাসে যাত্রীদের কাছ থেকে নেয়া হচ্ছে অতিরিক্ত ভাড়া। রাজশাহী হতে গোদাগাড়ী হয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জেরও অঘোষিত ভাড়া বেড়েছে ২০ থেকে ৩০ টাকা।
দেখা গেছে, টিকিটে ভাড়া ঠিকঠাক লেখা রয়েছে। কিন্তু যাত্রীরা গাড়িতে উঠার পর বলা হচ্ছে তেলের সংকট অতিরিক্ত টাকা দিয়ে তেল কিনতে হচ্ছে। যার কারণে যাত্রী প্রতি ২০ থেকে ৩০ টাকা বাধ্যতামূলক বেশি আদায় করা হচ্ছে। এমন কি যাত্রীদের বলেও দেয়া হচ্ছে এই ভাড়ার কথা কাউকে যেনো না জানানো হয়। কোনো যাত্রী অতিরিক্ত ভাড়া দিতে না চাইলে তাকে বাস থেকে নামিয়ে দেয়ার হুমকি দেয়া হয়। বিশেষ করে বড় কোম্পানী ছাড়া যত্রতত্রভাবে ভাবে যেসব বাস রাজশাহী থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে যায় সেসব বাসের চালকরা যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত এক থেকে দেড়শ টাকা ভাড়া বেশি আদায় করছে।
রাজশাহী থেকে চট্টগ্রামে যাওয়া যাত্রী ইলিয়াস জানান, ঈদের আগে ১৬শ’ টাকা ভাড়া দিয়ে আমি গিয়েছি। আবার এসেছি সাড়ে ১৫শ’ টাকা ভাড়া দিয়ে। আজ (গতকাল রোববার) আবার চট্টগ্রামে যাওয়ার জন্য কাউন্টারে যাওয়ার পর জানানো হয়, টিকিটের মূল্য যা আছে তাই থাকবে, কিন্তু অতিরিক্ত চারশ টাকা দিতে হবে। নইলে টিকিট দেয়া হবে না। উপায় না পেয়েই তাদের দাবি মেনে আমি চট্টগ্রামে যাচ্ছি। বাস চালকরা বড় অন্যায় করছেন বলেও তিনি মন্তব্য করেন। সিলেটে যাওয়া যাত্রী খুশবর রহমান প্রশ্ন তুলে জানান, এই অরাজকতার শেষ কোথায়। তেল সংকট থাকলে তো সরকার তেলের দাম বাড়াবে। সরকার তো তেলের দাম বাড়ায়নি। তাহলে ভাড়া কেনো বেশি নেয়া হচ্ছে। তবে কাউন্টারের লোকজন এসব বিষয়ে কথা না বললেও সুপারভাইজাররা বলছেন, তেল নিতে গেলে এক থেকে দেড় হাজার টাকা ফিলিং স্টেশন মালিককে বেশি দিতে হচ্ছে। এই টাকা তোলার জন্য যাত্রীদের কাছ থেকে বেশি ভাড়া নেয়া হচ্ছে। সংকট কেটে গেলে আর নেয়া হবে না বলেও তারা মন্তব্য করেন।
বিষয়টি নিয়ে রাজশাহী সড়ক পরিবহন গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম হেলাল জানান, যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়র করার বিষয়টি আমি জানি। কিন্তু তারা যাত্রী তোলার পর গন্তব্যের আগে বা মাঝ রাস্তায় গিয়ে এই টাকা নিচ্ছে। ভাড়া না বাড়লেও কিছু কিছু বাস চালকরা তেল সংকটের ওযুহাত দিয়ে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করছেন। তিনি বলেন, আমি ঢাকায় যাবো, সেখানে গিয়ে বিষয়টি তুলবো। অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের বিষয়টি সমাধান করা যায় কিনা দেখা হবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
এদিকে, রাজশাহীতে চলাচল করা সিএনজি চালকরা সব চেয়ে বেশি অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করছেন। তারা রীতিমত দরদাম করে যাত্রী তুলে গন্তব্যে যাচ্ছে। দরদামে না মিললে সেই যাত্রী সিএনজিতে উঠানো হচ্ছে না। রাজশাহী থেকে বাগমারা, তাহেরপুর, ভরানিগঞ্জ, মোহনগঞ্জ, তানোর, মোহনপুর, নওগাঁ, মান্দাসহ বিভিন্ন গন্তব্যে চলাচল করা সিএনজির ভাড়া বাড়ানো হয়েছে ৩০ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত। ১শ’ টাকার ভাড়া দেড়শ টাকা না দিলে যাত্রী তোলা হচ্ছে না। আবার দেশ টাকার ভাড়া দুইশ টাকা না হলেও যাত্রীদের নেয়া হচ্ছে না।
সিএনজির অরাজকতা নিয়ে তাহেরপুরের যাত্রী রহিদুল ইসলাম তার ফেনসবুক পোষ্টে লিখেছেন, কে রুখবে এমন অরাজকতা? তাহেরপুরে সিএনজি স্ট্যান্ডে চালক সিন্ডিকেট। মাস্টারের ফোন বন্ধ। তাহেরপুর-রাজশাহী রুটে ভাড়া নির্ধারিত ১০০ টাকা। কিন্তু চালক সিন্ডিকেট করে বলছে গাড়িতে গ্যাস নাই। ভাড়া ১৫০ টাকা হলে গ্যাস আছে। তিণি লিখেছেন, স্ট্যান্ডে সিএনজি আছে ২০টার মত। যাত্রী আছে, ৫০-৬০ জনের মত। আরও বাড়ছে যাত্রী। চালকরা সবাই সিএনজি রেখে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরছেন। ২ থেকে ১ জন ঘুরাঘুরি করলেও তারা চালক নয় বলে প্রচার করছেন। পরে ভাড়া ১৫০ টাকা দিতে চাইলে ওই ব্যক্তি বলছে আসেন দেখি কোনো ভাবে যাওয়া যায় কি না? এভাবেই একজন চালক স্ট্যান্ড ছাড়ছে আরেক জন স্ট্যান্ডে আসছে।
এমন চিত্র রাজশাহী নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ রুটের। নওগাঁর সাবাইহাটের যাত্রী খুরশেদ আলম বলেন, নির্ধারিত ভাড়া দিতে চাওয়ায় চালক আমাকে মোহনপুরে নামিয়ে দেন। পরে সেখানে অনেক মানুষ জড় হয়। রীতিমত ঘটনাটি হাতাহাটি পর্যায় পৌঁছায়। এক পর্যায়ে চালককে ৫০ টাকা বেশি দিতে চেয়ে আমি গন্তব্যে যাই। চাঁপাইনবাগঞ্জে রুটের সিএনজি যাত্রী খয়বুর রহমান জানান, চাঁপাইনবাগঞ্জে বাসের ভাড়া ৮০ টাকা, সেখানে নেয়া হচ্ছে ১২০ থেকে ১৩০ টাকা। আর সিএনজির ভাড়া ১শ’ টাকা। কিন্তু ১৬০ থেকে ১৭০ টাকার নিচে কেউ ভাড়া তুলছে না। তাদের এইটাই ওযুহাত তেল পাওয়া যাচ্ছে না। তারা তেল পাচ্ছে না আবার গাড়িও চলছে। এসব দেখবে কে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
রাজশাহী সিএনজি স্টেশনের মাস্টার হাসান আল মামুন বলেন, সিএনজি চালকরা চরম বেকায়দায় আছেন। তারা তেল ফিলিং স্টেশনে গিয়ে পাচ্ছেন না। আবার বাইরে থেকে তারা চোরাইভাবে অতিরিক্ত দামে তেল কিনছেন। অনেক সিএনজি চালক তেল না পেয়ে গাড়ি চালানো বন্ধ করে দিয়েছেন। একজন সিএনজি চালক অতিরিক্ত টাকা দিয়ে তেল কেনার পর যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া না নিলে কিভাবে টাকা উঠবে।
তিনি বলেন, তেলের সংকট কেটে গেলে এই অবস্থা আর থাকবে না। তিনি বলেন তেলের সংকট কাটাতে হলে আগে ফিলিং স্টেশনের মালিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। নইলে এই সংকট কাটবে না। তারা তেল নিয়ে এসে অতিরিক্ত দামে চোরাই পথে তেল বিক্রি করে সংকট তৈরি করছে। যার কারণে তেলের জন্য এতো হাহাকার শুরু হয়েছে।

