বরিশাল ব্যুরো:
দক্ষিণাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ নগরী বরিশাল ক্রমেই ভূমি দেবে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়ছে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতিবছর গড়ে প্রায় ১ দশমিক ৬৬ মিলিমিটার করে নিচে নামছে এ নগরীর মাটির স্তর। কোনো কোনো বছরে এই দেবে যাওয়ার পরিমাণ প্রায় ২৪ দশমিক ১৭ মিলিমিটার বা প্রায় এক ইঞ্চিতে পৌঁছেছে।
গবেষকরা বলছেন, এভাবে ভূমি নিচে নামতে থাকলে ভবিষ্যতে মারাত্মক বিপর্যয়ের আশঙ্কা রয়েছে। একপর্যায়ে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ও ভূমির সমতা তৈরি হলে সামান্য জোয়ারেও প্লাবিত হতে পারে বিস্তীর্ণ এলাকা।
গবেষণাটি পরিচালনা করে বাংলাদেশ ভূ-তাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তর এবং জার্মানির ফেডারেল ইনস্টিটিউট ফর জিওসাইন্স অ্যান্ড ন্যাচারাল রিসোর্সেস। এতে সহায়তা দেয় জার্মান উন্নয়ন সংস্থা এবং অর্থায়ন করে জাপান ইন্টারন্যাশনাল কোঅপারেশন এজেন্সি (জাইকা)।
২০১৪ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত টানা ছয় বছরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, বরিশাল নগরী ও আশপাশের এলাকায় ভূমির স্তর ধারাবাহিকভাবে নিচে নেমে যাচ্ছে। যদিও কিছু ক্ষেত্রে ভরাটের মাধ্যমে ভূমি উঁচু করার প্রবণতা দেখা গেছে, তবে তা প্রাকৃতিক নয় এবং দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর সমাধানও নয়।
গবেষণায় নগরীর বিভিন্ন এলাকায় ভবন হেলে পড়ার প্রমাণও পাওয়া গেছে। বিশেষ করে বিএম কলেজ এলাকা, বটতলা ও করিম কুটির এলাকায় নতুন নির্মিত ভবনেও ভার্টিক্যাল বিচ্যুতি লক্ষ্য করা গেছে। সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, স্যাটেলাইট ইমেজ বিশ্লেষণে প্রথম বিষয়টি ধরা পড়ে। পরে সরেজমিনে গিয়ে এর সত্যতা নিশ্চিত করা হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং ভূগর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত উত্তোলনই এই পরিস্থিতির প্রধান কারণ। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, আগে যেখানে ৭০০ থেকে ৮০০ ফুট গভীরে গেলেই সুপেয় পানি পাওয়া যেত, বর্তমানে তা পেতে ১০০০ থেকে ১১০০ ফুট পর্যন্ত গভীরে যেতে হচ্ছে।
অন্যদিকে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, গ্রীষ্ম মৌসুমে পানির স্তর নেমে যাচ্ছে ৩০ থেকে ৪০ ফুট নিচে, যা এক দশক আগেও ছিল ১৫ থেকে ২০ ফুটের মধ্যে।
পরিবেশবিদদের মতে, বর্তমান হারে ভূমি দেবে যাওয়া অব্যাহত থাকলে আগামী ৫০ থেকে ১০০ বছরের মধ্যে বরিশালের বিস্তীর্ণ এলাকা বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়তে পারে। সামান্য জোয়ার কিংবা জলোচ্ছ্বাসেও ডুবে যেতে পারে পুরো নগরী।
এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় এখনই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার কমিয়ে নদী, খাল ও পুকুরের পানি পরিশোধন করে ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। পাশাপাশি অপরিকল্পিত নগরায়ণ নিয়ন্ত্রণেরও পরামর্শ দিয়েছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সময় থাকতে সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করা গেলে এই সম্ভাব্য বিপর্যয় থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব।


