মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে যুদ্ধবিমান উড়ছে, আর তার প্রতিধ্বনি শোনা যাচ্ছে হাজার কিলোমিটার দূরে—বাংলাদেশের জ্বালানি বাজারে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরান হামলার পর পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে পুরো অঞ্চল। বৈশ্বিক জ্বালানি পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালি কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাসের প্রায় ২০ শতাংশ এই সরু সামুদ্রিক পথ দিয়ে যাতায়াত করে। এক পাশে ইরান, অন্য পাশে ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত—এই প্রণালি পার না হলে পারস্য উপসাগর থেকে জাহাজ বের হওয়ার আর কোনো পথ নেই।
ইরানের হুঁশিয়ারির পর প্রণালির প্রবেশমুখে নোঙর করে আছে অন্তত ১৫০টি তেলবাহী ট্যাংকার—জাহাজ চলাচলের তথ্য বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলার (Kpler) এমন তথ্য দিয়েছে। ঝুঁকি বেড়েছে, বিমার খরচ আকাশছোঁয়া। ফলে অনেক জাহাজই অপেক্ষায়।
এদিকে কাতার তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) উৎপাদন ও রপ্তানি সাময়িকভাবে বন্ধ করেছে। আর ইরানের ড্রোন হামলার পর সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি সৌদি আরামকো (Saudi Aramco) সতর্কতামূলকভাবে বন্ধ করেছে তাদের সবচেয়ে বড় শোধনাগার রাস তানুরা।
এই রাস তানুরা থেকেই প্রতিবছর সাত থেকে আট লাখ টন ‘অ্যারাবিয়ান লাইট ক্রুড’ আমদানি করে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। অপরিশোধিত এই তেল চট্টগ্রামের ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড–এ পরিশোধিত হয়ে দেশের বাজারে যায়। মার্চের শুরুতে এক লাখ টন তেল জাহাজে তোলার কথা ছিল। জাহাজ বন্দরে আছে, কিন্তু শোধনাগার বন্ধ—তেল লোডিং হবে কি না, তা অনিশ্চিত।
সমস্যা শুধু লোডিং নয়। তেল তুললেও জাহাজকে হরমুজ প্রণালি পেরোতে হবে। সামরিক নজরদারি ও নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে সেই যাত্রাও অনিশ্চিত। বিলম্ব হলে বাংলাদেশে অপরিশোধিত তেল পৌঁছাতে অতিরিক্ত সময় লাগবে।
বাংলাদেশের জ্বালানি কাঠামো প্রায় পুরোপুরি আমদানিনির্ভর। জ্বালানি তেলের প্রায় শতভাগই বাইরে থেকে আসে। অপরিশোধিত তেলের পুরোটা সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে। আবার দেশের গ্যাস চাহিদার প্রায় ৩৫ শতাংশ আসে আমদানি করা এলএনজি থেকে—যার বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর।
অপরিশোধিত তেলের দাম ইতিমধ্যে ১০ শতাংশ বেড়ে ৮০ ডলারের কাছাকাছি। বিশ্লেষকেরা বলছেন, যুদ্ধ দীর্ঘ হলে ব্যারেলপ্রতি দাম ১০০ ডলার ছাড়াতে পারে। এলএনজির দামও ২০ থেকে ২৫ শতাংশ বেড়েছে। একই সঙ্গে ডলারের দাম বেড়ে যাওয়ায় আমদানি খরচ আরও বাড়বে।
বিপিসির চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান বলেছেন, দেশের মোট আমদানির প্রায় ২০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল হরমুজ হয়ে আসে। বাকি ৮০ শতাংশ পরিশোধিত তেল চীন, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া থেকে আসে—যেখানে হরমুজের ওপর নির্ভরতা নেই। ফলে তাৎক্ষণিক বড় ঝুঁকি না থাকলেও অপরিশোধিত তেল নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
বর্তমানে দেশে ডিজেলের মজুত আছে প্রায় ২ লাখ ১৭ হাজার টন—যা দিয়ে ১৪–১৫ দিন চলা সম্ভব। পেট্রল, অকটেন ও ফার্নেস তেলের মজুতও কিছুটা স্বস্তি দিচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের জ্বালানি সরবরাহ ধারাবাহিক আমদানিনির্ভর। একাধিক চালান বিলম্বিত হলে চাপ তৈরি হবেই। বিশেষ করে ডিজেলের সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে কৃষি, পরিবহন ও বিদ্যুৎ খাতে বড় প্রভাব পড়বে। এখন বোরো মৌসুম চলছে, সামনে গ্রীষ্ম—বিদ্যুতের চাহিদা বাড়বে।
গ্যাস পরিস্থিতিও কম উদ্বেগের নয়। দেশে দৈনিক চাহিদা ৩৮০ কোটি ঘনফুট, সরবরাহ হচ্ছে ২৬৫ কোটি ঘনফুট। এর মধ্যে ৯৫ কোটি ঘনফুট এলএনজি। গ্রীষ্ম সামনে রেখে আমদানি বাড়িয়ে ১০৫ কোটি ঘনফুট করার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু সরবরাহ বিঘ্নিত হলে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে লোডশেডিং বাড়তে পারে, পাইপলাইনে গ্যাসের চাপ কমে রান্নায়ও ভোগান্তি হতে পারে।
পেট্রোবাংলা এ বছর ১১৫টি এলএনজি কার্গো আমদানির পরিকল্পনা করেছে। এর মধ্যে ৪০টি কাতার ও ১৬টি ওমান থেকে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায়। কাতার এলএনজির বড় সরবরাহকারী, আর তাদের জাহাজও আসে হরমুজ হয়ে। আপাতত ১২ মার্চ পর্যন্ত সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা নেই বলে জানানো হলেও নতুন জাহাজ আসা ব্যাহত হলে পরিস্থিতি বদলে যেতে পারে।
এর আগে ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময়ও একই রকম অস্থিরতা দেখা গিয়েছিল। এলএনজির দাম ৬০ ডলার ছাড়িয়ে যায়। বাংলাদেশ ৩৬ ডলার পর্যন্ত কিনলেও পরে আর পারেনি। টানা সাত মাস খোলাবাজার থেকে আমদানি বন্ধ রাখতে হয়েছিল। গ্যাস সংকট, বিদ্যুৎ ঘাটতি ও লোডশেডিং তখন নিত্যসঙ্গী হয়ে উঠেছিল।
সাবেক জ্বালানি বিশেষ সহকারী ম তামিম সতর্ক করে বলেছেন, যুদ্ধ দীর্ঘ হলে ঘোর বিপদ। বিভিন্ন দেশ আমদানির জন্য ঝাঁপিয়ে পড়বে, দাম বাড়তেই থাকবে। দেশের মজুত খুব বেশি নয়—তাই দ্রুত বিকল্প উৎস নিশ্চিত করা জরুরি।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধক্ষেত্রে গর্জন শোনা যাচ্ছে কামানের, কিন্তু তার ছায়া পড়ছে বাংলাদেশের রান্নাঘর, ক্ষেতখামার আর বিদ্যুৎকেন্দ্রে। এখন প্রশ্ন একটাই—এই ঝড় কত দিন স্থায়ী হবে, আর বাংলাদেশ কতটা প্রস্তুত সেই দীর্ঘ ঝড় সামলাতে?

