ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতা হারানোর পর অস্তিত্ব সংকটে পড়া আওয়ামী লীগের মাঠপর্যায়ের নেতা-কর্মীদের মধ্যে এখন তীব্র হতাশা ও উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে। বিদেশের নিরাপদ আশ্রয়ে থেকে দল পরিচালনা করা আর সম্ভব নয় উল্লেখ করে তৃণমূলের নেতারা মনে করছেন, দল পুনর্গঠন করতে হলে শীর্ষ নেতাদের এখন গ্রেপ্তারের ঝুঁকি নিয়ে হলেও দেশে ফেরা প্রয়োজন।
নির্বাচনের পর পরিস্থিতির উন্নতি হবে—এমন এক ক্ষীণ আশা ছিল দলটির স্থানীয় পর্যায়ের নেতাদের মনে। অনেকের ধারণা ছিল, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় বিএনপি সরকার গঠন করলে হয়তো তারা এলাকায় ফেরার এবং সীমিত পরিসরে সাংগঠনিক কাজ করার সুযোগ পাবেন। আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞাও হয়তো থাকবে না। কিন্তু বাস্তবতা পুরোপুরি ভিন্ন। মাঠপর্যায়ের নেতাদের মতে, পরিস্থিতির কোনো দৃশ্যমান পরিবর্তন হয়নি এবং রাজনীতি করার চেষ্টা করলেই তারা বাধার মুখে পড়ছেন।
তৃণমূলের অনেক নেতা জানান, নির্বাচনের আগে সাধারণ ভোটারদের ভোট পেতে বিএনপি ও জামায়াতের পক্ষ থেকে তাদের প্রতি কিছুটা নমনীয়তা দেখানো হয়েছিল। এছাড়া বিএনপির নেতারা দল নিষিদ্ধ করার বিপক্ষে অবস্থান নেওয়ায় আওয়ামী লীগের কর্মীদের মধ্যে কিছুটা আশার সঞ্চার হয়েছিল। সেই আশা থেকেই অনেক জায়গায় আওয়ামী লীগের কর্মীরা সাধারণ ভোটারদের বিএনপিকে ভোট দিতে বলেছিলেন। কিন্তু ভোটের পর সেই সমীকরণ বদলে গেছে।
তৃণমূল নেতাদের দাবি, কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব সামনে না থাকলে কর্মীদের চাঙ্গা করা অসম্ভব। তারা মনে করছেন, ঢাকা কেন্দ্রিক রাজনীতি সচল করতে হলে শীর্ষ নেতাদের উপস্থিতি বাধ্যতামূলক। তবে কেন্দ্রীয় নেতাদের অবস্থান ভিন্ন। আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দীন নাছিম জানান, নেতারা উপযুক্ত সময়ের অপেক্ষায় আছেন।
তিনি প্রশ্ন তোলেন, বর্তমান আইনি প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগের কোনো নেতা-কর্মীর রাজনীতি করার সুযোগ আছে কি না। বিশেষ করে জাতীয় সংসদে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ–সংক্রান্ত বিল পাস এবং সাবেক স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীর গ্রেপ্তারের পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে বলে তিনি মনে করেন।
সম্প্রতি খুলনা ও দেশের বিভিন্ন স্থানে দলীয় কার্যালয় খোলার ঝটিকা চেষ্টা চালানো হলেও তা সফল হয়নি। খবর ছড়িয়ে পড়ার পর পুনরায় হামলার শিকার হয়েছে কার্যালয়গুলো। স্থানীয় নেতারা এখন কেবল আত্মগোপনে থেকে একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ রাখাকেই ‘দলীয় কাজ’ হিসেবে দেখছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, একদিকে সংসদের কঠোর আইন, অন্যদিকে কেন্দ্রীয় নেতাদের অনুপস্থিতি ও আইনি ঝুঁকি—সব মিলিয়ে আওয়ামী লীগের সংকট কাটার কোনো লক্ষণ আপাতত নেই। তৃণমূল নেতারা শীর্ষ নেতাদের দেশে ফেরার ডাক দিলেও, বাস্তব পরিস্থিতির কারণে দলটির পুনর্গঠন প্রক্রিয়া এক গভীর অনিশ্চয়তায় ঘেরা।

