ডুরান্ড লাইনের পাহাড়ি আঁধার তখনও কাটেনি। সীমান্তের ওপারে-এপারে টানটান উত্তেজনা। খাইবার পাখতুনখোয়ার আফগান সীমান্তবর্তী এলাকায় অবস্থিত পাক সেনাচৌকিগুলোতে হঠাৎ অতর্কিত হামলা—গুলির শব্দ ছড়িয়ে পড়ে রাতের নিস্তব্ধতায়। কয়েকজন পাকিস্তানি সেনা নিহত হন, কয়েকজনকে অপহরণ করা হয়।
তালেবান মুখপাত্র জাবিহুল্লা মুজাহিদ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে বার্তা দেন—তাদের সেনারা নাইট ভিশন ও লেজার-নিয়ন্ত্রিত অস্ত্র ব্যবহার করেছে। হুঁশিয়ারিও আসে কঠোর ভাষায়।
এই ঘটনার পরপরই পাকিস্তানের পক্ষ থেকে পাল্টা প্রতিক্রিয়া আসে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে পোস্ট করে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ ঘোষণা দেন, আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু হয়েছে। তিনি লেখেন, “আমাদের ধৈর্য্যের বাঁধ ভেঙে গেছে। এখন আপনাদের সঙ্গে আমাদের কেবল যুদ্ধ হবে।”
এরই অংশ হিসেবে শুরু হয় ‘অপারেশন গজব-লিল হক’। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুল এবং পাকতিয়া ও কান্দাহার প্রদেশে আফগান সামরিক বাহিনীর স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে হামলা চালায় পাকিস্তানের বিমান বাহিনী।
আজ শুক্রবার ভোর ৪টা ৫০ মিনিটে এক্সে দেওয়া বার্তায় পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ–এর বিদেশি সংবাদমাধ্যম বিষয়ক মুখপাত্র মোশাররফ জাইদি জানান, রাত ৩টা ৪৫ মিনিট থেকে পাকিস্তান বিমান বাহিনী (পিএএফ) ও স্থলবাহিনী যৌথভাবে অভিযান শুরু করেছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, কাবুল, পাকতিয়া ও কান্দাহারের ২৭টি সেনাচৌকি ধ্বংস এবং ৯টি চৌকি দখল করেছে পাকিস্তানের আর্মি।
তিনি আরও দাবি করেন, পিএএফের বোমাবর্ষণে আফগান সেনাবাহিনীর দুটি সেনা হেডকোয়ার্টার, তিনটি ব্রিজ হেডকোয়ার্টার, দুটি গোলাবারুদের ডিপো, একটি লজিস্টিক ঘাঁটি, তিনটি ব্যাটালিয়ন হেডকোয়ার্টার, দুটি সেক্টর হেডকোয়ার্টার, ৮০টিরও বেশি ট্যাংক এবং বিপুলসংখ্যক আর্টিলারি বন্দুক ও সাঁজোয়া যান ধ্বংস হয়েছে।
এই উত্তেজনার শিকড় অবশ্য আরও আগে। গত ২১ ফেব্রুয়ারি আফগানিস্তানের নানগারহার ও পাকতিয়া প্রদেশে ব্যাপক বোমাবর্ষণ করেছিল পাকিস্তানের বিমান বাহিনী। এতে ৮০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হন। সে সময় পাকিস্তানের আন্তঃসংযোগ দপ্তর আইএসপিআর জানায়, নিষিদ্ধ গোষ্ঠী তেহরিক-ই তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি)-এর ঘাঁটি লক্ষ্য করেই এ অভিযান চালানো হয়েছিল। তবে আফগানিস্তানের ক্ষমতাসীন তালেবান সরকার পাল্টা দাবি করে, জঙ্গিঘাঁটি নয়—লোকালয়ে হামলা হয়েছে, এবং এর বদলা নেওয়া হবে।
ডুরান্ড লাইনের সেই অন্ধকার রাতে যখন গুলির শব্দ মিলিয়ে যায়, তখনই যেন শুরু হয় নতুন অধ্যায়। সীমান্তের দুই পাশেই যুদ্ধের প্রস্তুতি, আকাশে যুদ্ধবিমানের গর্জন, মাটিতে ট্যাংকের অগ্রগতি—‘অপারেশন গজব-লিল হক’ নামের এই অধ্যায় কেবল সামরিক পদক্ষেপ নয়, বরং দীর্ঘদিনের উত্তেজনার বিস্ফোরিত রূপ।
পাহাড়ঘেরা সীমান্তে আবারও অনিশ্চয়তার ছায়া নেমে এসেছে। যুদ্ধের ঘোষণায় দুই দেশের সম্পর্ক নতুন এক সংঘাতের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে—যেখানে প্রতিটি বার্তা, প্রতিটি হামলা, ইতিহাসের নতুন পাতা লিখছে।

