তাইওয়ান একটি দ্বীপ রাষ্ট্র, যা দীর্ঘকাল ধরে রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও সামরিক বিবাদের কেন্দ্রস্থল হয়ে আছে। চীনের মূল ভূখণ্ড থেকে প্রায় ১৬০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই দ্বীপটি যুগে যুগে বিভিন্ন শাসকের অধীনে থেকেছে এবং শেষ পর্যন্ত একটি স্বতন্ত্র গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। তবে চীন এখনো তাইওয়ানকে তাদের অংশ হিসেবে দাবি করে, যা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু।
প্রাচীন এবং ঔপনিবেশিক যুগ (প্রাক-১৬৮৩)
(১) তাইওয়ানের আদি বাসিন্দা
- খ্রিস্টপূর্ব ৬,০০০ বছর আগে তাইওয়ানে প্রথম মানব বসতি স্থাপিত হয় বলে ধারণা করা হয়।
- দ্বীপটির আদি বাসিন্দারা মূলত অস্ট্রোনেশিয়ান জাতিগোষ্ঠীর অংশ, যারা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছিল।
- তাদের সংস্কৃতি ও ভাষা এখনো তাইওয়ানের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যে দেখা যায়।
(২) ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক যুগ
- ১৬২৪ সালে ডাচরা তাইওয়ানে প্রথম ঔপনিবেশিক শাসন কায়েম করে এবং দ্বীপটির দক্ষিণ অংশে একটি উপনিবেশ গড়ে তোলে।
- ১৬২৬ সালে স্পেনিশরা দ্বীপটির উত্তর অংশ দখল করে, তবে ১৬৪২ সালে ডাচরা তাদের বিতাড়িত করে।
- ডাচ শাসনকালে চীনা অভিবাসীদের আগমন ঘটে, যারা কৃষিকাজ এবং ব্যবসার জন্য দ্বীপে বসতি স্থাপন করে।
(৩) কক্সিঙ্গার শাসন (১৬৬২-১৬৮৩)
- মিং রাজবংশের সমর্থক চীনা সেনাপতি কক্সিঙ্গা (ঝেং চেংগং) ১৬৬২ সালে ডাচদের পরাজিত করে তাইওয়ানে একটি চীনা রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন।
- তিনি চিং রাজবংশের (Qing Dynasty) বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন, তবে তার মৃত্যুর পর ১৬৮৩ সালে চিং সাম্রাজ্য তাইওয়ান দখল করে।
চিং সাম্রাজ্যের শাসন (১৬৮৩-১৮৯৫)
- চিং সাম্রাজ্যের শাসনে তাইওয়ানকে চীনের ফুজিয়ান প্রদেশের অধীনস্থ করা হয়।
- এই সময়ে চীনা অভিবাসন ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায় এবং দ্বীপে কৃষি ও বাণিজ্যের প্রসার ঘটে।
- ১৮৮৫ সালে চিং সরকার তাইওয়ানকে একটি স্বতন্ত্র প্রদেশ হিসেবে ঘোষণা করে।
জাপানের অধীনে তাইওয়ান (১৮৯৫-১৯৪৫)
- ১৮৯৫ সালে প্রথম চীন-জাপান যুদ্ধের পর শিমোনোসেকি চুক্তির মাধ্যমে চীন তাইওয়ানকে জাপানের হাতে তুলে দেয়।
- ১৮৯৫-১৯৪৫ পর্যন্ত জাপান তাইওয়ানকে তাদের উপনিবেশ হিসেবে পরিচালনা করে।
- এই সময়ে আধুনিক অবকাঠামো গড়ে ওঠে, শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নতি হয় এবং শিল্পোন্নয়ন ঘটে।
- তবে জাপানের দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে তাইওয়ানে বেশ কয়েকটি বিদ্রোহ সংঘটিত হয়।
- দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের (১৯৩৯-১৯৪৫) শেষে ১৯৪৫ সালে জাপানের পরাজয়ের পর তাইওয়ান আবার চীনের কাছে ফিরে যায়।
গৃহযুদ্ধ ও কুওমিনতাং সরকারের আগমন (১৯৪৫-১৯৪৯)
- ১৯৪৫ সালের অক্টোবর মাসে চীনা জাতীয়তাবাদী সরকার (Kuomintang বা KMT) আনুষ্ঠানিকভাবে তাইওয়ানের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে।
- তবে জাতীয়তাবাদী সরকারের দুর্নীতি ও দমননীতি জনগণের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি করে।
- ১৯৪৭ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি তাইওয়ানের জনগণ জাতীয়তাবাদী সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ গড়ে তোলে, যা “২/২৮ হত্যাকাণ্ড”নামে পরিচিত। এতে হাজার হাজার তাইওয়ানবাসী নিহত হয়।
(১) চীনা গৃহযুদ্ধ ও কুওমিনতাংয়ের তাইওয়ানে আশ্রয় নেওয়া
- ১৯৪৯ সালে চীনে জাতীয়তাবাদী (KMT) সরকার এবং কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যে গৃহযুদ্ধের পর মাও সেতুংয়ের নেতৃত্বে চীনের কমিউনিস্টরা বিজয়ী হয় এবং গণপ্রজাতন্ত্রী চীন (People’s Republic of China – PRC) প্রতিষ্ঠিত হয়।
- চিয়াং কাই-শেকের নেতৃত্বাধীন কুওমিনতাং সরকার চীন থেকে পালিয়ে তাইওয়ানে আশ্রয় নেয় এবং সেখানে “চীন প্রজাতন্ত্র (Republic of China – ROC)” সরকারের ঘোষণা দেয়।
- কুওমিনতাং সরকার দাবি করে যে তারা সমগ্র চীনের বৈধ সরকার।
তাইওয়ানের আধুনিক যুগ (১৯৪৯-বর্তমান)
(১) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন
- ১৯৫০-এর দশকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানকে সমর্থন দেয় এবং চীনের কমিউনিস্ট শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে।
- ১৯৫৪ ও ১৯৫৮ সালে তাইওয়ান প্রণালীতে দুই দফা সামরিক সংঘর্ষ ঘটে।
- ১৯৭৯ সালে যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে গণপ্রজাতন্ত্রী চীনকে (PRC) স্বীকৃতি দিলেও, তাইওয়ান রিলেশনস অ্যাক্ট অনুযায়ী তাইওয়ানের প্রতিরক্ষায় সাহায্য অব্যাহত রাখে।
(২) একদলীয় শাসন থেকে গণতন্ত্রে উত্তরণ
- কুওমিনতাং সরকার প্রথমে কঠোর সামরিক শাসন চালায়, যা ১৯৮৭ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে নেওয়া হয়।
- ১৯৯৬ সালে তাইওয়ানে প্রথমবারের মতো সরাসরি প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, যা গণতন্ত্রের পথে দেশটির এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
(৩) চীন-তাইওয়ান সম্পর্কের টানাপোড়েন
- চীন এখনও তাইওয়ানকে তাদের অংশ বলে দাবি করে এবং “এক চীন নীতি” অনুসরণ করে।
- চীন ও তাইওয়ানের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক থাকলেও, রাজনৈতিক ও সামরিক উত্তেজনা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে।
- চীন বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থায় তাইওয়ানকে সদস্যপদ পেতে বাধা দেয়।
(৪) বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি
- ২০১৬ ও ২০২০ সালে তাইওয়ানে তাইওয়ানিজ জাতীয়তাবাদী দল (DPP) জয়ী হয়, যা চীনের সঙ্গে দূরত্ব বজায় রাখার নীতি অনুসরণ করে।
- ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তাইওয়ানের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা নির্ধারিত হবে।
তাইওয়ানের ইতিহাস একটি সংগ্রামের গল্প—একটি দ্বীপের যে বিভিন্ন শাসকের অধীনে থেকেছে, ঔপনিবেশিক দখলদারিত্ব সহ্য করেছে, গৃহযুদ্ধের শিকার হয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। তবে চীনের সঙ্গে এর সম্পর্ক এখনো উত্তেজনাপূর্ণ, এবং ভবিষ্যতে এই সংকট কীভাবে সমাধান হবে, তা আন্তর্জাতিক রাজনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ এক প্রশ্ন হয়ে থাকবে।
