নরসিংদীর মাধবদীতে দীর্ঘদিন ধরে প্রভাব বিস্তার করে আসা বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোটের নেতা ও মাধবদী পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর পরিমল ঘোষ ওরফে কেশব বাবুকে ঘিরে নতুন করে নানা অভিযোগ সামনে আসছে।
স্থানীয়দের দাবি, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও বিভিন্ন মহলের সঙ্গে লিয়াজো বজায় রেখে তিনি এখনো এলাকায় প্রভাব খাটিয়ে চলেছেন। তার কর্মকাণ্ডে সাধারণ মানুষ নানাভাবে হয়রানির শিকার হচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, মাধবদী পৌরসভা প্রতিষ্ঠার পর থেকেই কেশব ঘোষ এলাকায় শক্তিশালী একটি প্রভাববলয় তৈরি করেন। প্রায় আড়াই দশক ধরে সেই বলয়ের মাধ্যমে নানা ধরনের প্রভাব বিস্তার ও নির্যাতনের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। ফলে দীর্ঘ সময় পার হলেও এলাকার কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয়েছে বলে দাবি করছেন স্থানীয়রা।
কেশব ঘোষের প্রতিষ্ঠিত একটি মিষ্টির দোকান নিয়েও রয়েছে বিভিন্ন অভিযোগ। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, দোকানে প্রায়ই ক্রেতাদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করা হয়। অনেক সময় কোনো ক্রেতা মিষ্টি কিনতে চাইলে একজন কর্মচারী বিক্রি করতে গেলেও তার ছেলে পলাশ ঘোষ বা বিকাশ ঘোষ এসে জানান, মিষ্টিটি আগেই বিক্রি হয়ে গেছে। এতে ক্রেতারা অপ্রয়োজনীয় ভোগান্তিতে পড়েন।
এছাড়া মিষ্টি তৈরির জন্য দুধ সরবরাহকারী মধ্যস্থতাকারীদের পাওনা টাকাও দীর্ঘদিন ধরে আটকে রাখার অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা দাবি করেন, কেশব ঘোষের ছেলে পলাশ ঘোষ ও বিকাশ ঘোষ বিভিন্ন সময় তাদের পাওনা পরিশোধে গড়িমসি করছেন।
স্থানীয় সাংবাদিকদেরও অভিযোগ, কেশব ঘোষের বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির তথ্য সংগ্রহ করতে গেলে তার ছেলেরা সাংবাদিকদের সঙ্গে অসদাচরণ করেন এবং ‘মববাজি’ করার চেষ্টা করেন। বাবার প্রভাব বলয় ধরে রাখতে তারাও সক্রিয়ভাবে ভূমিকা রাখছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে মাধবদীতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা ও গুলিবর্ষণের ঘটনায়ও পরিমল ঘোষ ওরফে কেশব বাবুর নাম উঠে এসেছে। এ ঘটনায় দায়ের হওয়া একটি মামলায় তাকে আসামি করা হয়েছে।
মামলার নথি অনুযায়ী, মাধবদী থানায় দায়ের করা মামলায় দণ্ডবিধি ১৮৬০ এর ১৪৩/১০৯/৩২৬/৩৪ ধারায় তাকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। তিনি মাধবদী শহরের বাসিন্দা এবং স্থানীয় আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে সম্পৃক্ত বলে অভিযোগ রয়েছে।
মামলার বিবরণে উল্লেখ করা হয়েছে, গত বছরের কোটা সংস্কার আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় দেশব্যাপী শিক্ষার্থীদের কর্মসূচির অংশ হিসেবে মাধবদীতেও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কর্মসূচি চলছিল।
২১ সেপ্টেম্বর দুপুরে মাধবদী পৌরসভার সামনে শিক্ষার্থীরা শান্তিপূর্ণ অবস্থান কর্মসূচি পালন করছিলেন।
অভিযোগ রয়েছে, ওই সময় পরিমল ঘোষের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের অর্ধশতাধিক নেতাকর্মী লাঠিসোটা ও আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে সেখানে এসে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। এতে কয়েকজন শিক্ষার্থী আহত হন এবং এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
মামলার অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, হামলার এক পর্যায়ে গুলিবর্ষণের ঘটনাও ঘটে। এতে এক শিক্ষার্থী গুরুতর আহত হন। তাকে প্রথমে নরসিংদী সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয় এবং পরে অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকার একটি বিশেষায়িত হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।
ঘটনার পর আহত শিক্ষার্থীর পরিবার মাধবদী থানায় মামলা দায়ের করেন। তদন্ত শেষে পুলিশ আদালতে দাখিল করা প্রতিবেদনে মামলার অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ঘটনার সময় স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী কিছু রাজনৈতিক ব্যক্তির উপস্থিতি ও উসকানির বিষয়টিও তদন্তে উঠে এসেছে। এতে ঘটনাটি এলাকায় ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, মামলার তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত অভিযুক্ত পরিমল ঘোষ ওরফে কেশব বাবুকে জেল হাজতে আটক রাখা প্রয়োজন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে তিনি বর্তমানে জামিনে রয়েছেন বলে একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে।

