ববি প্রতিনিধি:
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (ববি) প্রথম বর্ষের এক শিক্ষার্থীকে র্যাগিংয়ের নামে সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের চার সিনিয়র শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে।এসময় ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী রুম থেকে বের হওয়ার আকুতি জানালে তাকে পা দিয়ে পিষে মেরে ফেলার হুমকি দেয়া হয়। ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী রুম থেকে বের হওয়ার এ ঘটনায় রোববার (৩০ নভেম্বর) ওই শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন।
ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী আল শাহরিয়ার মোহাম্মদ মোস্তাকিম মজুমদার। ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী আজ পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ও উপাচার্যের কাছে অভিযুক্ত চার শিক্ষার্থীর শাস্তির দাবি জানিয়ে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।
অভিযুক্ত শিক্ষার্থীরা হলেন, নাফিজ ফারদিন আকন্দ স্বপ্নীল, মোহাম্মদ শামীম উদ্দিন, ইমন মাহমুদ, নেহাল আহমেদ ও মিরাজ। তারা পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের ১০ তম ব্যাচের শিক্ষার্থী।
ভুক্তভোগী আল শাহরিয়ার বলেন, আমাকে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করা হয়েছে। শীতের রাতে আমার শার্ট প্যান্ট খুলতে বাধ্য করেছে। গভীর রাতে আমার সাথে যে অমানবিক নির্যাতন করা হয়েছে তাতে আমি আমার জীবন নিয়ে শঙ্কিত। বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার পরবর্তী পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া এবং আমার জীবনের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা চাচ্ছি।
গত বুধবার (২৬ নভেম্বর) রূপাতলি টোল প্লাজায় একটি মেস বাসায় রাত ১০টা থেকে রাত ২টা পর্যন্ত আল শাহরিয়ার মোস্তাকিমকে নির্যাতন করা হয়।
লিখিত অভিযোগো আল শাহরিয়ার বলেন, আমি বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়েরধ পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের ১১তম ব্যাচ এবং বিশ্ববিদ্যালয়েরধদ ১৪তম ব্যাচের একজন শিক্ষার্থী। গত ২৬ নভেম্বর, বুধবারধ রাত আনুমানিক ৮টার দিকে আমাদের ইমিডিয়েট সিনিয়রদের নির্দেশে রুপাতলী হাউজিং মাঠে উপস্থিত হই। আমরা মোট ২৮ জন শিক্ষার্থী সেখানে উপস্থিত ছিলাম।
পরে তারা আমাদেরকে রাত ৯টা ৩০ মিনিটের বাসে করে টোল প্লাজার নিকট অবস্থিত ইমিডিয়েট সিনিয়র নেহাল ভাইয়ের (নেহাল আহম্মেদ, ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষ) বাসায় নিয়ে যায়। বাসায় প্রবেশের পর আমাদেরকে তিনতলা কক্ষে উঠিয়ে গেট আটকে দেয়। এরপর আমাদের কাছ থেকে মোবাইল ফোনসহ সকল ইলেকট্রনিক ডিভাইস নিয়ে নেওয়া হয়, যাতে আমরা কোনো প্রমাণ রাখতে না পারি। তারপর আমাদের এক ব্যাচমেটকে ইন্ট্রো দেয়ার জন্য বলে, তখন রাত প্রায় ১০.৩০ বেজে যায়। আমি এক সিনিয়র ভাই কে বলি ভাই ১১ টায় তো আমাদের বাসার গেট বন্ধ করে দেয়। তারপর ওনি সবাইকে বিষয়টা বলে। এটা শোনার পর নেহাল ভাই আমাকে দাঁড় করিয়ে শামীম ভাই (মোহাম্মদ শামীম উদ্দীন, ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষ) আর সপ্নীল ভাই (নাফিজ ফারদিন আকন্দ সপ্নীল, ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষ), এর হাতে তুলে দেয় ব্যাগ দেয়ার জন্য।
সপ্নীল ভাই তখন আমাকে জঘন্য ভাষায় কবিতা আবৃত্তি করতে দেয়। আমি না বললে আমাকে বলে” যদি তুই আবৃত্তি না করিস তাহলে তুই মেন্টাল, তোর মাথায় সমস্যা,” আমার বাবা মাকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে। এগুলো শুনে আমার কান্না চলে আসে। আমার চোখে পানি দেখে শামীম ভাই বলে “তুই সিম্পেথি পাওয়ার জন্য কান্না করতেছোস। তাই তুই ফ্লোরে বসে ১০ মিনিট কান্না করবি এখন। তারপর আমাকে তারা কবিতার এক্সপ্রেশন করার কথা বলে, যেখানে আমাকে মেয়ে আর আমার দুজন সহপাঠীকে ছেলে ক্যারেক্টার বানায়, আমাদেরকে ফিজিক্যাল রিলেশানের অভিনয় করতে বলে। এটা আমি নিতে পারছিলাম না। তাই আমি বের হয়ে আসার চিন্তা করি। শামীম ভাই তখন লাঠি নিয়ে আসে আমাকে মারতে। নেহাল ভাই বলে, তুই যদি এ রুমের বাহিরে যাস তাহলে তোরে পা দিয়ে পিষে মেরে ফেলবো। তখন আমি আর কি করবো বাধ্য হয়ে হাঁটু গেরে শামীম ভাই এর কাছে মাফ চাই।
সপ্নীল ভাই আমাকে এক পায়ে দাড়াতে বলল, মিরাজ ভাই আর ইমন ভাই (ইমন মাহমুদ, ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষ) আমাকে ওয়ান কোয়ার্টার প্যান্ট দিয়ে বলল,” এটা পড়ে নাচ” আমি তখন বলি ভাই আমি একটু ওয়াশরুমে যাবো প্রশ্রাব করতে। তারা আমাকে একটি বোতল দিয়ে বলে সবার সামনে রুমের মধ্যেই প্রশ্রাব কর। বহু কষ্টে আমি যখন ওয়াশরুমে যাই তখন সপ্নীল ভাই বলল “দরজা খোলা রেখে প্রশ্রাব কর”। কিন্তু আমি ওয়াশরুমে গিয়ে দরজা বন্ধ করেই অনেকক্ষণ কান্না করি। ওয়াশরুম থেকে বের হওয়ার পর স্বপ্নীল আর ইমন ভাই বলল “শার্ট আর প্যান্ট খোল, তারপর মাস্টারবেশন কর” আমাকে তারা শীতের রাতে শেষ পর্যন্ত শার্ট খুলতে বাধ্য করে। এরপর স্বপ্নীল ভাই আমাকে একটা বিস্কিট দিয়ে বলে “কুকুরের মতো চেটে চেটে খা” পরে আমি অনেক কান্না করি বসে বসে, এরপরও তারা আমাকে অনেক মানসিক নির্যাতন করে।
পুরো ঘটনায় তারা আমাকে মানসিক, শারীরিক এবং নৈতিকভাবে চরমভাবে অপমান ও নির্যাতন করে। রাত প্রায় ২টা পর্যন্ত এই নির্যাতন চলতে থাকে। এই ঘটনা আমাকে ভীষণ ভীত, মানসিকভাবে বিপর্যন্ত এবং অসম্মানিত করেছে। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের নিরাপত্তা ও মানসিক সুস্থতার জন্য আমি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছি। আমি আমার জীবনের নিরাপত্তা চাচ্ছি।
অতএব, উল্লিখিত ঘটনায় জড়িত উক্ত চারজন সিনিয়রের বিরুদ্ধে যথাযথ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বিনীত অনুরোধ জানাচ্ছি।
অভিযুক্ত পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী স্বপ্নিল বলেন, শাহরিয়ারসহ ওদের ব্যাচের অনেকে ঐরাতে আমাদের বাসায় ছিলো। শাহরিয়ারের সাথে উপস্থিতভাবে কিছুটা অসদাচরণ করা হয়েছে যার জন্য আমরা অনুতপ্ত বিষয়টি আমাদের ভুল হয়েছে।
এই বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. তৌফিক আলম বলেন, ” অভিযোগটি পেয়েছি, র্যাগিংয়ের বিষয়ে আমাদের জিরো টলারেন্স নীতি রয়েছে।”
পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “কমিটি গঠন করা হবে, এবং কমিটিই পরবর্তী সিদ্ধান্ত দেবে।”

