সত্যজিৎ দাস (মৌলভীবাজার প্রতিনিধি):
দেশে বর্তমানে ১৬৭টি চা বাগানে প্রায় ৯ লাখ মানুষের বসবাস। এসব বাগানে নিয়মিত ও অনিয়মিত মিলিয়ে প্রায় দেড় লাখ শ্রমিক কাজ করেন। সময়ের পরিবর্তনে চা শ্রমিক পরিবারের অনেক সন্তান উচ্চশিক্ষা অর্জন করে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছেন। তবে এখনো বাগানের বড় একটি অংশ কুসংস্কার,কুশিক্ষা ও মদ্যপানের মতো সমস্যায় জর্জরিত। বিশেষ করে মদের আসক্তি বেকারত্ব ও সামাজিক সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
চা শ্রমিক ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়,অনেক বাগানেই এখনো প্রায় ৫০ থেকে ৫৫ শতাংশ মানুষ নিয়মিত মদ পান করেন। তবে যেসব বাগানে শিক্ষার হার তুলনামূলক বেশি,সেখানে এই প্রবণতা কিছুটা কমেছে।
চা বাগান এলাকায় বহুল প্রচলিত শব্দ ‘মদের পাট্রা’ বলতে সাধারণত লাইসেন্সপ্রাপ্ত দেশি মদের দোকান বা নির্দিষ্ট আড্ডাস্থলকে বোঝায়। ব্রিটিশ আমল থেকেই চা শ্রমিকদের বিনোদনের অংশ হিসেবে বাগান এলাকায় এ ধরনের ব্যবস্থার প্রচলন রয়েছে।
মৌলভীবাজার জেলার বিভিন্ন চা বাগানে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে,বৈধ মদের তুলনায় অবৈধ মদের বিক্রি অনেক বেশি। অনেক ক্ষেত্রে বৈধ দোকান থেকে অল্প পরিমাণ মদ নিয়ে তার সঙ্গে চোলাই মদ মিশিয়ে বিক্রি করা হয়। অনুসন্ধানে জানা যায়,যেখানে ১০০ কেজি বৈধ মদ বিক্রি হয়,সেখানে প্রায় ১০০০ কেজি অবৈধ মদ বিক্রি হচ্ছে। সন্ধ্যা নামলেই এসব এলাকায় মদের বেচাকেনা শুরু হয়। নেশাগ্রস্ত হয়ে অনেক শ্রমিক পরিবারে সহিংসতা ও নির্যাতনের ঘটনাও ঘটছে।
মৌলভীবাজার মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়,জেলায় ৯২টি চা বাগানে মোট ৪৫টি বৈধ মদের পাঠ্যা রয়েছে। এখান থেকেই শ্রমিকরা বৈধভাবে মদ সংগ্রহ করেন। তবে অবৈধভাবে চোলাই মদ বিক্রির অভিযোগে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে অধিদপ্তর। পাশাপাশি পুলিশ ও ডিবি পুলিশও পৃথকভাবে অভিযান চালাচ্ছে।
চা শ্রমিক নেতারা বলছেন,বাগানে কর্মসংস্থানের অভাব বড় একটি সমস্যা। অনেক বাগানে একজন শ্রমিক কাজ করলে চার থেকে পাঁচজন বেকার থাকেন। আইন অনুযায়ী প্রতি একর জমিতে নির্দিষ্টসংখ্যক শ্রমিক নিয়োগের বিধান থাকলেও তা অনেক ক্ষেত্রে মানা হয় না। ফলে প্রচুর আবাদযোগ্য জমি অনাবাদি পড়ে থাকলেও নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে না।
বাগান পঞ্চায়েত কমিটির সদস্যদের অভিযোগ, চা চাষের অনুপযোগী জমি শ্রমিকদের ধান চাষের জন্য দেওয়া হলেও প্রতি একর জমি থেকে প্রায় ১১ মণ ধান বাগান কর্তৃপক্ষকে দিতে হয়। অনেক সময় শ্রমিকদের রেশন থেকে সেই পরিমাণ চাল কেটে রাখা হয়। অথচ এসব জমি শ্রমিকদের নামে স্থায়ীভাবে বরাদ্দ দেওয়া হলে তাদের জীবিকার একটি স্থায়ী সুযোগ তৈরি হতে পারত। কিন্তু সরকার জমি বরাদ্দ দেয় বাগান কর্তৃপক্ষকে,আর শ্রমিকদের সেই জমি ব্যবহারে নানা শর্তের মুখে পড়তে হয়।
উচ্চশিক্ষা অর্জনকারী চা শ্রমিক পরিবারের সদস্যদের মতে,বাগান থেকে মদের পাঠ্যা বন্ধ করা না গেলে চা শ্রমিকদের জীবনে বড় কোনো পরিবর্তন আসবে না। তাদের ভাষায়,“নেশা ও সভ্যতা একসঙ্গে চলতে পারে না।” তারা মনে করেন,মদের সহজলভ্যতার কারণে অনেক শ্রমিক বাগানের বাইরে কাজ খোঁজার আগ্রহ হারাচ্ছেন,যা বেকারত্বকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
চা শ্রমিক নেতাদের অভিযোগ,শ্রমিকদের দাবি-দাওয়া নিয়ে কথা বললেই এখনো অনেক ক্ষেত্রে ব্রিটিশ আমলের আইনে মামলা দিয়ে চাপ সৃষ্টি করা হয়। তাদের মতে,সরকার ও বাগান মালিকরা চাইলে বেকারত্ব দূর করা সম্ভব,কিন্তু তার পরিবর্তে শ্রমিকদের মধ্যে মদের সংস্কৃতি টিকিয়ে রাখা হচ্ছে।
বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও শ্রমিক নেতা রামভজন কৈরি বলেন,বাগানের ভেতর থেকে বাইরে বের হয়ে অন্য পেশায় যাওয়ার প্রবণতা এখনো তেমন তৈরি হয়নি। তবে শিক্ষা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মদ্যপানের প্রবণতা ধীরে ধীরে কমছে। তিনি জানান,কমলগঞ্জ উপজেলার আলীনগর চা বাগান থেকে শতাধিক তরুণ-তরুণী বর্তমানে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছেন। এ ধারা অন্য বাগানেও ছড়িয়ে পড়লে শ্রমিকদের জীবনমান উন্নত হবে।
তিনি আরও বলেন,সরকার যদি চা বাগান এলাকায় মদের পাঠ্যা বন্ধের উদ্যোগ নেয়, তাহলে সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তন ত্বরান্বিত হতে পারে।
এ বিষয়ে মৌলভীবাজার মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. রাশেদুজ্জামান বলেন,জেলার চা বাগানগুলোতে মোট ৪৫টি বৈধ মদের পাঠ্যা রয়েছে। এর মধ্যে শ্রীমঙ্গলে একটি দোকানে বিদেশি মদ বিক্রি করা হয়। অবৈধ চোলাই মদ বিক্রির বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চালিয়ে সংশ্লিষ্টদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে।

