জুলাই বিপ্লবের অন্যতম আইকন ও ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরীফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের এক মাস পেরিয়ে গেলেও ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছে মূল ঘাতক ও পরিকল্পনাকারীরা। গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, খুনিরা বর্তমানে ভারতের বাণিজ্যিক রাজধানী মুম্বাইয়ের একটি সুরক্ষিত এলাকায় আত্মগোপন করে আছে। তবে ভারতের পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো সহযোগিতা না পাওয়ায় তদন্ত প্রক্রিয়ায় স্থবিরতা দেখা দিয়েছে।
নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর উচ্চপর্যায়ের তথ্যমতে, হত্যাকাণ্ডের মূল অভিযুক্ত ছাত্রলীগ নেতা ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে দাউদ এবং তার সহযোগী আলমগীর শেখ সীমান্ত পার হয়ে প্রথমে পশ্চিমবঙ্গের স্পেশাল টাস্কফোর্সের (এসটিএফ) নজরে আসে। গত ২৮ ডিসেম্বর পশ্চিমবঙ্গ থেকে পাঁচজন বাংলাদেশিকে আটক করা হয়, যারা হাদি হত্যার আসামিদের পালাতে লজিস্টিক সহায়তা দিয়েছিল। আটককৃতদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক আওয়ামী লীগ নেতার পিএস মাসুদুর রহমান বিপ্লব এবং যুবলীগ নেতা তাইজুল ইসলাম চৌধুরী ওরফে বাপ্পী।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই পাঁচজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারলে হত্যাকাণ্ডের মাস্টারমাইন্ডদের পরিচয় স্পষ্ট হতো। তবে ভারতের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো সুস্পষ্ট তথ্য বা সহযোগিতা পাওয়া যায়নি। ফলে খুনিরা নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে পশ্চিমবঙ্গ থেকে মুম্বাইয়ে স্থানান্তরিত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তি এবং পারস্পরিক আইনি সহায়তা (MLAT) থাকা সত্ত্বেও ভারত খুনিদের ফেরত দিতে বা তথ্য শেয়ার করতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে। কলকাতায় অবস্থিত বাংলাদেশ উপ-হাইকমিশন আনুষ্ঠানিকভাবে আটকদের হস্তান্তরের অনুরোধ জানালেও ভারতের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে, খুনিরা তাদের ভূখণ্ডে নেই।
একজন ঊর্ধ্বতন গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানান, “আটককৃত পাঁচজন ছিল মামলার মূল সূত্র। তাদের বিষয়ে ভারতের এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা তদন্তের একটি বড় পথ বন্ধ করে দিচ্ছে।”
তদন্ত সংশ্লিষ্টদের মতে, হাদি হত্যাকাণ্ড ছিল একটি সুপরিকল্পিত মিশন। গত ৪ ডিসেম্বর থেকেই ফয়সাল ও তার দল হাদির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা তৈরির চেষ্টা করে। এমনকি তারা হাদির নির্বাচনী প্রচার টিমেও যুক্ত হতে সক্ষম হয়। ১২ ডিসেম্বর জুমার নামাজ শেষে পল্টনের বক্স কালভার্ট এলাকায় হাদিকে লক্ষ্য করে অত্যন্ত কাছ থেকে গুলি চালায় ফয়সাল।
হত্যাকাণ্ডের পর ওই রাতেই ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট সীমান্ত দিয়ে তারা দেশ ত্যাগ করে। পুরো প্রক্রিয়াটিতে যুবলীগ ও ছাত্রলীগের একটি সুসংগঠিত নেটওয়ার্ক কাজ করেছে বলে প্রমাণ পেয়েছে ডিবি ও অন্যান্য সংস্থা।
হাদি হত্যার বিচার দাবিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এখনো ট্রেন্ডিং হ্যাশট্যাগ #JusticeForHadi। নেটিজেনরা ভারতের এই অসহযোগিতাকে আইনের শাসনের পরিপন্থী হিসেবে দেখছেন। অনেকের প্রশ্ন—চিহ্নিত অপরাধীরা সিসিটিভি ফুটেজে ধরা পড়ার পরও প্রতিবেশী দেশে কীভাবে নিরাপদ আশ্রয় পায়?
এ বিষয়ে অপরাধ বিশ্লেষক ও অধ্যাপক ড. ওমর ফারুক বলেন, “এই হত্যাকাণ্ড একটি আন্তর্জাতিক সংঘবদ্ধ চক্রের ইঙ্গিত দেয়। অপরাধীরা যদি বিদেশের মাটিতে নিরাপদ থাকে, তবে তা ভবিষ্যতে দেশে আরও সহিংসতাকে উৎসাহিত করবে। ইন্টারপোলের রেড নোটিস জারি করার চেয়েও এই মুহূর্তে প্রতিবেশী দেশের সরাসরি রাজনৈতিক সহযোগিতা বেশি জরুরি।”
বর্তমানে তদন্তকারীরা আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড নোটিস জারির প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে জানা গেছে। তবে ভারতের সদিচ্ছা ছাড়া এই বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

