রিপন মারমা, কাপ্তাই (রাঙ্গামাটি) প্রতিনিধি :
প্রকৃতি যেন নিজ হাতে সাজিয়েছে রাঙ্গামাটির কাপ্তাইকে। এক দিকে বিশাল নীল জলরাশি, অন্যদিকে আকাশছোঁয়া সবুজ পাহাড়। এই পাহাড়ের বুক চিরে বয়ে চলা কর্ণফুলী নদী যেন বঙ্গোপসাগরের দিকে ধাবমান এক রূপালি রেখা।
কাপ্তাই জাতীয় উদ্যানের প্রবেশমুখেই পর্যটকদের স্বাগত জানায় ঐতিহাসিক রাম পাহাড় ও সীতা পাহাড়। এই দুই পাহাড়ের মাঝখান দিয়ে বয়ে গেছে কর্ণফুলী নদী, যা চট্টগ্রামের মোহনায় মিলেছে।
কাপ্তাইয়ের এই দুই পাহাড়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস ও রামায়ণের ইতিহাস। জনশ্রুতি অনুযায়ী, ত্রেতা যুগে পিতৃসত্য পালনের জন্য বনবাসকালে শ্রী রামচন্দ্র, দেবী সীতা ও লক্ষণ এই পাহাড়ে অবস্থান করেছিলেন। পাহাড়ের পাদদেশে বয়ে চলা কর্ণফুলী নদীতে দেবী সীতা স্নান করতেন, যার নামানুসারে পাহাড় দুটির নামকরণ হয়েছে। বর্তমানে সীতা পাহাড়ে একটি মন্দির রয়েছে, যেখানে প্রতি বছর নির্দিষ্ট তিথিতে পুণ্যার্থীরা ভিড় করেন। রাম পাহাড়ের উচ্চতা প্রায় ১০০ ফুট, আর সীতা পাহাড় ১৫০ থেকে ২০০ ফুট পর্যন্ত।
কাপ্তাই জাতীয় উদ্যান একসময় হরেক প্রজাতির বন্যপ্রাণীর অভয়ারণ্য ছিল। তবে বন সংকুচিত হওয়া ও শিকারিদের কারণে বন্য মুরগি ও বিভিন্ন দুর্লভ পাখি এখন বিলুপ্তপ্রায়। তবে আশার কথা হলো, বনে এখনও প্রায় ৫৫টি বন্য হাতির একটি দল বিচরণ করছে, সম্প্রতি এ দলে একটি হাতি শাবকের জন্ম হয়েছে। মাঝে মাঝে এখানে বিশাল অজগর সাপও দেখা যায়। বনের এই ঐতিহ্য রক্ষায় নিরলস কাজ করছেন কাপ্তাই রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. ওমর ফারুক স্বাধীন।
পর্যটনের অপার হাতছানি:
কাপ্তাই মানেই বৈচিত্র্যের মেলা। দেশের একমাত্র কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র, এশিয়ার বৃহত্তম কেপিএম (KPM) পেপার মিল, সবুজের চাদরে ঢাকা ওয়াগ্গা চা বাগান এবং আধুনিক সুবিধাসমৃদ্ধ ‘নিসর্গ রিভার ভ্যালী এন্ড পড হাউস’ পর্যটকদের আকর্ষণ করে। ঐতিহাসিক চিৎমরম বৌদ্ধ বিহার এবং নৌ-বিহারের সুযোগও রয়েছে। ট্রেকিং পছন্দকারীদের কাছে সীতা পাহাড়ের চূড়া অত্যন্ত জনপ্রিয়। এখান থেকে কাপ্তাই লেক ও কর্ণফুলী নদীর সর্পিলাকার দৃশ্য দেখা যায়।
রাম ও সীতা পাহাড় কেবল ধর্মীয় স্থান নয়; এটি পার্বত্য চট্টগ্রামের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সমৃদ্ধ লোকজ ঐতিহ্যেরও অংশ। সব মিলিয়ে কাপ্তাই জাতীয় উদ্যান ও এর আশপাশ বাংলাদেশের পর্যটন খাতের এক অমূল্য সম্পদ। তবে বন্যপ্রাণী ও বনভূমি রক্ষা করা না গেলে এই সৌন্দর্য অচিরেই ম্লান হয়ে যেতে পারে। সরকারি নজরদারি ও স্থানীয় সচেতনতা কাপ্তাইয়ের ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ।


