পরনে আভিজাত্যমাখা শিফন শাড়ি, নিখুঁতভাবে আঁকা ভ্রু, আর চোখে বড় সানগ্লাস—জনপরিসরে এভাবেই দেখা যেত সদ্য প্রয়াত বিএনপি চেয়ারপার্সন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে। বাংলাদেশের রক্ষণশীল রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তিনি কেবল একজন সফল নেত্রীই ছিলেন না, বরং নিজের রুচি ও ব্যক্তিত্ব দিয়ে গড়ে তুলেছিলেন এক অনন্য ‘স্টাইল স্টেটমেন্ট’। বিশ্লেষকরা বলছেন, গত ৪০ বছর ধরে রাজনীতির মাঠে নারীদের সাজপোশাকের চিরাচরিত ধারণা একাই বদলে দিয়েছিলেন তিনি।
গৃহবধূ থেকে রাজপথের আইকন ১৯৮১ সালে স্বামী সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর যখন তিনি রাজনীতিতে আসেন, তখন তার অবয়ব ছিল সাধারণ এক শোকার্ত গৃহবধূর মতো। সাদা সুতি বা তাঁতের শাড়ি আর মাথায় আধোঘোমটা টেনে তিনি হাল ধরেন দলের, নেতৃত্ব দেন স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের। তবে নব্বইয়ের দশকে ক্ষমতায় আসার পর তার সাজপোশাকে এক ধরনের ‘এলিগেন্ট’ বা মার্জিত পরিবর্তন আসে।

আন্দোলনের মাঠের সেই সাধারণ সুতি শাড়ির জায়গা নেয় একরঙা সিল্ক, জর্জেট বা শিফন। শাড়ির সাথে মানানসই শাল, সামনে থেকে খানিকটা ফুলিয়ে বাঁধা চুল আর পরিমিত অলঙ্কার—সব মিলিয়ে খালেদা জিয়া হয়ে ওঠেন এক আইকনিক ব্যক্তিত্ব। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নাহরিন আই খান একে দেখছেন প্রথা ভাঙার গল্প হিসেবে। তিনি বলেন, ওনার অ্যাপেয়ারেন্স আমাদের রক্ষণশীল সমাজের বিধবার চিরাচরিত রূপকে ভেঙে দেওয়ার একটি শক্তিশালী অবস্থান ছিল।
আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে আধুনিক বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি ১৯৯৩ সালে মার্কিন গণমাধ্যম ‘দ্য নিউইয়র্ক টাইমস’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে খালেদা জিয়া বাংলাদেশের সহনশীল ইসলামী ধারা এবং কর্মক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সহাবস্থানের কথা জোর দিয়ে বলেছিলেন। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি বিশ্বকে দেখিয়েছিলেন যে, ধর্মীয় মূল্যবোধ বজায় রেখেও একজন নারী আধুনিক ও ফ্যাশনেবল হতে পারেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদের মতে, খালেদা জিয়া নির্বাচনের আগে কখনোই ভোট পাওয়ার আশায় নিজের রূপ পরিবর্তন করেননি। কোনোদিন তাকে হিজাব বা তসবিহ হাতে কৃত্রিম ধার্মিকতার লেবাস নিতে দেখা যায়নি।

প্রশংসা ও রাজনৈতিক কটাক্ষ খালেদা জিয়ার এই আধুনিক সাজপোশাক যেমন অনেক নারীর কাছে অনুকরণীয় হয়ে উঠেছিল, তেমনি প্রতিপক্ষ রাজনীতিকদের কাছ থেকে তাকে সইতে হয়েছে তীব্র কটাক্ষ। খোদ ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ অনেক রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বিভিন্ন সময়ে সংসদে বা জনসভায় তার মেকআপ এবং আঁকা ভ্রু নিয়ে বিদ্রূপ করেছেন। বিশ্লেষকরা মনে করেন, পুরুষতান্ত্রিক সমাজে একজন নারী নেত্রীর এমন স্বতন্ত্র ও আধুনিক ইমেজ অনেকে ‘হজম’ করতে পারেননি বলেই ব্যক্তিগত আক্রমণকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।
অদম্য নেতৃত্ব ও জনপ্রিয়তা মজার বিষয় হলো, যেসব ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল নারী নেতৃত্বকে সহজে মেনে নিতে চায় না, তারাও রাজনৈতিক প্রয়োজনে খালেদা জিয়ার পেছনেই কাতারবন্দী হয়েছিলেন। তার আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা এবং অদম্য ব্যক্তিত্বের কাছে তারা মাথা নত করতে বাধ্য হয়েছিলেন। জীবনে কোনো নির্বাচনে না হারা এই নেত্রী প্রমাণ করেছেন, ব্যক্তিত্ব এবং আভিজাত্যের সাথে আপস না করেও গণমানুষের নেতা হওয়া সম্ভব।

মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি তার সেই চিরচেনা আভিজাত্য ধরে রেখেছিলেন। রাজনীতিতে তার অবদান নিয়ে নানা বিতর্ক থাকলেও, বাংলাদেশের নারী রাজনীতিকদের সাজপোশাক ও উপস্থাপনায় তিনি যে আধুনিকতার ছাপ রেখে গেছেন, তা এক অনস্বীকার্য অধ্যায় হয়ে থাকবে।


